বিচারকরা মুগ্ধ চোখে ছেলেটার কথা শুনছেন।ছেলেটার নাম অমিত হাসান।তার কণ্ঠ সপ্তম পর্যায়ে।সে বারবার তার আঙ্গুল আমার দিকে তুলে আমার ভুল ত্রুটি ধরছে আর বিচারকদের কাছে যুক্তি দিচ্ছে যে আমার বক্তব্য কি পরিমাণে ভিত্তিহীন।
আজ স্কুলে ছিল weekly debate tournament ।দশম শ্রেণিদের মাঝে।এক টিমে একজন অসুস্থ।তাই বাংলা শিক্ষক জোর করে আমাকে সেখানে ঢুকিয়ে দিলেন।অন্যদের দেখেও মনে হচ্ছিল না তারা আমাকে পেয়ে খুশি।তারা সব বাঘা বাঘা বক্তা।প্রথম বক্তা সজীব চৌধুরী। অত্যন্ত বাস্তববাদী আর ভালো ছাত্র।বাংলাদেশের রাজনীতি মনেহয় সজীবই ক্লাসের একমাত্র ছেলে যে গুরুত্ব দেয়।ওর খুব ইচ্ছা একটা রাজনৈতিক দল তৈরি করার।মাঝে মাঝে সে তার দলের উদ্দেশ্য,আদর্শ,কর্মসূচি কি হবে তা নিয়ে সবাইকে পড়ে শোনায়। সবাই বিরক্ত হলেও প্রকাশ করে না।কারণ ক্লাসে ওর অবস্থান খুব শক্ত।দ্বিতীয় বক্তা আমি।আমার নাম মারুফ হোসেন।আমার আগ্রহ কবিতায়।যা কেউই না পড়লেও আমি পড়ি।ভালো লাগে। কবিদের ক্ষমতা আমাকে মুগ্ধ করে।অতি সাধারণ বিষয় তারা কত সুন্দরভাবে লিখে। তারাই একটা প্রজাপতির ডানার সঙ্গে একটি মেয়ের চুলের তুলনা করতে পারেন এবং সেই তুলনার সমালোচনা কেউ করে না- কি ভাগ্য তাদের।
সজীবদের মতো অত দাপট আমার নেই ক্লাসে।আমি অতি সাধারণ, ভদ্র ছেলে।ক্লাসের ছাত্রদের নিজস্ব গ্রুপ আছে।সেই গ্রুপ কয়দিন পর পর রোড ট্রিপে যায় অথবা কোনো জায়গায় ঘুরতে যায়।সেখানে স্মার্ট থেকে কুৎসিত,,ধনী হতে গরীব - সব থাকলেও আমার জায়গা নেই।দশ বছরের স্কুল জীবন আমার।তাই এখন এসবে অভ্যাস হয়ে গেছে।অবশ্য আমি মোটামুটি ছাত্র।এই যোগ্যতাটা মাঝে মাঝে স্নান্নিধ্য এনে দেয়
তৃতীয়জনের নাম মাহমুদ কবির।জাতীয় পর্যায়ের ডিবেটে ফার্স্ট হওয়া।ক্লাসে রোল ১। আমি এসেছিলাম ডিবেট দেখতে।বক্তৃতা আমার ভালো লাগে। এত ছেলেদের সামনে দাড়িয়ে বক্তৃতা দেওয়া কম কঠিন নয়।আমি এসব পারি না।গলা শুকিয়ে যায়।হাত পা কাঁপে। চোখ দিয়ে পানি পড়ে।তাও বদরুল স্যার আমাকে ডেকে ডিবেটে ঢুকিয়ে দিলেন।আমার প্রতি তার অন্যরকম স্নেহ।ক্লাস ৮ এ ভাইভা নিয়েছিলেন।কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা পড়ানো হত তখন।৫ নম্বরের ভাইভা।ভাইভাতে জিজ্ঞাসা করলেন -তুই কি হবি বড় হয়ে?
আমি বললাম - স্যার,ফেরিওয়ালা।
বলার পর হুঁশ ফিরল।কি বললাম এটা।উনি খুবই বদমেজাজী।সবাই আমার দিকে তাকিয়ে থাকল।চরম বেয়াদবি হয়ে গেছে এটা।
স্যার আবার প্রশ্ন করলেন- কিসের ফেরিওয়ালা?
ভাবলাম চালানো যায়।বেয়াদবি কখনো করিনি।এখন করলে ক্ষতি কি যা হবার হয়ে গেছে।আমি বললাম - কথার ফেরিওয়ালা।
স্যার অবাক হয়ে বললেন- মানে?
-স্যার কবিদের কবিতা ভালো লাগে।তাদের কথাগুলো খুবই সুন্দর। তাই ঠিক করেছি বড় হয়ে কবিদের বই বিক্রি করে বেড়াব।
বেয়াদবির কোনো সীমা ছিল না।আর আমি মনে মনে তৈরি হচ্ছিলাম স্যারের অপমান সহ্য করার জন্য।তখনই স্যার হেসে উঠলেন।উনি সবাইকে বলে উঠলেন- ঐ তোরা দেখছিল না যে আমি হাসছি?তোরাও হাস।এখনই হাস।
সবাই নকলভাবে হাসতে লাগল।এভাবে স্যারের সাথে আমার সখ্য গড়ে উঠলো।
বিষয়ঃ মাদকই সমাজের মূল্যবোধ নষ্টের একমাত্র কারণ।
দুর্ভাগ্যক্রমে আমরা হয়ে গেলাম বিপক্ষে। মাদক এর বিরুদ্ধে যুক্তি দেওয়া কঠিন।কিন্তু সিলেকশন হয়ে গেছে।এখন ডিবেট করতে হবেই।
সজীব আর মাহমুদ আলোচনা করতে লাগল আমাকে বাদ দিয়ে।কেউই কিছু বের করতে পারল না দেখে বলি দারিদ্র।কারণ দারিদ্রের কারণেই মানুষ চুরি,ডাকাতি করতে বাধ্য হয়,মূল্যবোধ বিসর্জন দেয়।মাদক তো বহু পরের ব্যাপার।দারিদ্র না থাকলে কেউ হতাশ হয়ে মাদক নেয় না।কিন্তু সজীব বেছে নিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।তার মতে এটাই মানবিক মূল্যবোধ নষ্টের কারণ।পুরোপুরি হাস্যকর একটা টপিক।আমি বললাম- সজীব,বিচারকরা বিরক্ত হবে আমাদের উপর এই বক্তব্য শুনে।
মাহমুদ বলে উঠলো- তুমি কি জানো?ডিবেট কয়দিন কর?
এভাবে একটা হাস্যকর যুক্তি দিয়ে আমার ডিবেট শুরু করলাম।
ডিবেট পক্ষদের দ্বারা শুরু হল।পক্ষের প্রথম জন মাদকের পক্ষে অতুলনীয় যুক্তি দিল এবং তাদের দ্বিতীয় বক্তা সুন্দরমতো তা বিশ্লেষণ করল।সজীব আমাদের পক্ষে যেসব যুক্তি ঠিক করেছিলো তা মোটেও পছন্দ হয়নি আমার।তবে মুখ ফুটে বলতে যাই নি।কারণ বলা অর্থহীন।
পক্ষের দ্বিতীয় বক্তা যেসব প্রেক্ষাপট দিল তা সত্যিই মুগ্ধকর এবং আজব ব্যাপার তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে তাদের বক্তৃতার একটা অংশ বানিয়ে নিল।আমি মাহমুদকে জিজ্ঞাসা করলাম - ওরা তো আমাদের কথাই বলে ফেলল।
মাহমুদ উদাস গলায় বলল- ভেবে নাও নতুন কিছু
আমি অবাক হয়ে বললাম - এক মিনিটের মধ্যে আমি কি ভাববো?
তখনই বিচারকের কণ্ঠ শুনলাম -ধন্যবাদ পক্ষ দলের দ্বিতীয় বক্তা সুবিন আহমেদ।এখন আমি বিপক্ষে দলের দ্বিতীয় বক্তা মারুফ হোসেনকে বক্তৃতা দিতে আহবান করছি।
বিচারক যখন নাম বলল,তখন মনে হল আমি পাতালে চলে যাচ্ছি।আমার গলা শুকিয়ে যেতে লাগল।মঞ্চটাকে মনে হতে লাগল একটা মৃত্যুকূপ।যাতে আমাকে ঝাপ দিতে আদেশ করা হয়েছে। আমার মস্তিষ্কে কে যেন বলছিলো - তুই অকর্মা,তোরে দিয়ে কিছু হবে না।তুই জন্মেছিস অপমানিত হওয়ার জন্য।যখন মাইকের কাছে দাড়ালাম ভয় আরো বেড়ে গেল।সজীবরা আমার দিক অগ্নিদৃষ্টি দিচ্ছে।আমি কোনমতে আমার বক্তৃতা দিলাম।যখন শেষ হল,খেয়াল করে দেখলাম বিচারকদের মুখে বিরক্তির ছাপ।
ডিবেট যখন শেষ হল,তখন দেখা গেল আমরা দুই পয়েন্টের জন্য হেরে গেছি।আমার অস্পষ্ট বক্তৃতার জন্য।
২
বাসায় আজ রান্না হয়নি।ছোটমামা বাইরে গেছেন খাবার আনতে।নানী নিজের ঘরে বসে কুরআন পড়ছেন।মা অসুস্থ। বুকে ব্যাথা উঠেছে।মার নাম হাফসা খানম।সরকারি চাকরি করলেও সরকারি বাসা না নিয়ে বাড্ডায় নিয়ে এসেছেন আমাকে।বাড্ডায় আমার নানার বাড়ি। সরকারি বাসাটা বাবা খায়রুল হোসেনের নামে ছিল।বাবার মৃত্যুর পর বাসা মার নামে হলেও মা বাসা নেননি।
বাড্ডা হাতিরঝিল পার হয়ে আসতে হয়।রাস্তাঘাট প্রচন্ড খারাপ এখানকার। কারেন্ট দিনে তিন চার যায়।তছাড়া মশার উপদ্রবও অনেক।দিনেও মশারি টাঙিয়ে শুতে হয়।আগে এই জায়গাটা খাল বিলের জন্য বিখ্যাত ছিল।
এখন সব ভরাট হয়ে গিয়েছে।
নানার চাকরি চলে যায় এরশাদের আমলে।অভিযোগ দায়িত্বে গাফিলতির। অথচ নানা কঠোর নামাযী, আর মূল্যবোধের লোক ছিলেন।অফিসে তার নামে কেন এরকম অভিযোগ হল সেটা আমি জানি না।কেউ বলেও নি।তখন তিনি তার জমানো কিছু টাকা আর গ্রামের জমি বিক্রি করে বাড্ডায় একতলার একটা বাড়ি করেন।বাড়ির ছাদ টিনের হলেও দেয়ালগুলো ইট, সিমেন্টের তৈরি।বাড়ির চারপাশ আরেকটা দেওয়াল দ্বারা ঘেরাও করা।বড় গেট খুলে বাড়িতে ঢুকতে হয়।বাড়ির সামনে বৃহৎ উঠান।নানাভাই বিভিন্ন গাছ লাগিয়েছেন এখানে।তবে তার প্রিয় জাম গাছটা কিছুদিন আগে ঝড়ে ভেঙে দুই টুকরা হয়ে গেছে।অন্যসব গাছ এখনো আছে।শুধু ফলের গাছ দেখতে বিদঘুটে লাগে বলে খালামণি কিছু ফুলের গাছ টবে পুঁতে বড় করছেন।খালামণির নাম ফরিদা খানম।উনিও সরকারি চাকুরি করেন।খালু দুইবছর আগে মারা গেছেন।খালুর মৃত্যুর পর তাঁর শ্বশুরবাড়ির থেকে অভিযোগ করল যে খালামণি নাকি খালুকে মেরেছেন।এসব নিয়ে কম নাটক হয়নি।থানা পর্যন্ত গড়িয়েছে।যদিও কিছুই প্রমাণিত হয়নি।তবে খালামণি মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছেন।রাতে তার ঘুম হয় না।মাঝে মাঝে গভীর রাতে দেখি উনি বারান্দার চৌকিতে বসে আছেন।মাঝে মাঝে মনে হয় আমিও ওনার মতো হয়ে যাব।আমারো একই অবস্থা হচ্ছে ইদানিং। রাতে প্রচুর দুঃস্বপ্ন দেখি।আমি চাই না আমার জীবনটা কষ্টের হোক।কিন্তু যখন প্রিয়জনদের শুধু শুধু কষ্ট পাওয়ার কাতরতা দুচোখ দিয়ে উপলব্ধি করতে হয়,তখন নিজেরো যে একই অবস্থা হবে তা ভেবে নেওয়া স্বাভাবিক। মনে হতাশার প্রভাব এত বেশি যে আমি ইচ্ছা করলেই কারো সাথ এখন আর মিশতে পারি না।
মা ইশারা দিয়ে চলে যেতে বললেন।আমি কথা বাড়ালাম না।নানীর ঘর হতে ফোঁপানোর শব্দ আসছে।দুপুর বেলাতেই কেমন ছিমছিম ভাব বাড়িটাতে।
উঠানে মোড়া নিয়ে বসে পড়লাম হেডফোন আর স্মার্টফোন নিয়ে।কিছুক্ষণ গান শুনব।এরপর যদি খাবার না পাই তবে পানি খেয়ে লম্বা একটা ঘুম দিব।ক্ষুধার্ত অবস্থায় আমার ঘুম ভালো হয়।বাবার মৃত্যুর পর কয়েকমাস এভাবে থাকতে থাকতে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে।বাড্ডায় ঠিকমত ওয়াই ফাই থাকে না। ভাগ্যিস আজ আছে।নেট অন করতেই দেখলাম অরণি অনলাইনে। প্রোফাইল পিকচার চেঞ্জ করেছে।নতুন ছবিটায় ওর চুল খোপা করা।পড়নে হালকা নীল রঙের শাড়ি। দেখলাম ম্যাসেজ দিয়ে বলেছে - আজ কি লিখলে?
হায় অরণি!কোন কারণে ওর সাথে আমার দেখা হয়েছিল জানি না।পারলে দিনটাকে সরিয়ে ফেলতাম জীবন থেকে। আফসোস, সেই ক্ষমতা মানুষদের নেই।আমি মন, অর্থ,সমাজ- সব দিকে দিয়ে ফতুর।ওর সাথে দেখা হওয়া যদি কোনো পরীক্ষা হয়, তবে বলা যায় আমি ফেল করেছি।অরণির বয়ফ্রেন্ডের নাম রাতুল। তিন বছরের প্রেম ওদের।সেই প্রেম ভেঙ্গে যাক- এমন আশা করা অনুচিত। কিন্তু মাঝে মাঝে যখন রাতে বসে লিখি একা একা,তখন আফসোস যে ওদের প্রেমটা যদি ভেঙ্গে যেত।ওর ছবি দেখে এত ছোট বয়সে ওর প্রতি যে তীব্র শারীরিক আর মানসিক আকর্ষণ আমি বোধ করি,তা ভালোবাসা কিনা জানি না।আমি আমার বর্তমান ছোটজীবনে সবসময় ভালোবাসার বিরুদ্ধে। কারণ ভালোবাসা যেমন মানুষকে মনের উপর রাজত্ব করতে শেখায়,তেমনি চিরস্থায়ী ভিখারিও করে।আমি এর সাক্ষী।বাবা মার মাঝে যে ভালোবাসা ছিল তা দেখেই এসব শিখেছি।আমার জীবনে ভালোবাসা আসলে আমি যে ভিক্ষুক হব সেটা নিশ্চিত।
অরণির সাথে দেখা হয়েছিল মগবাজারে। আমরা তখন মতিঝিলে থাকতাম। মগবাজারে যেতাম গিটার শিখতে। গিটার বাবার খুব পছন্দের ছিল।নিজে শিখতে পারেননি তাই আমাকে জোর করে শিখিয়েছেন।যার কাছে শিখতাম তার নাম খৈয়াম সানু সন্ধি।।
আমি তখন গিটারে গান তোলার পর্যায়ে চলে গিয়েছি।যেদিন প্রথম গান তুলব সেদিন ও এলো।দরজায় নক করে কেমন ভগ্ন গলায় বলেছিল- ভাইয়া,আসব?
সন্ধি ভাইয়া বললেন - হ্যাঁ আসো
ওর সব আমার মনে আছে।পরনে ছিল জিনসের প্যান্ট আর ফতুয়া।ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। সেদিনের ক্লাসে সবাই পুরাতন ছাত্র ছিল।অরণির ছিল প্রথম ক্লাস। সন্ধি ভাই এমন পরিস্থিতিতে এক পুরনো ছাত্রকে দিয়ে নতুন ছাত্রকে শেখান।কেউই যখন রাজি হচ্ছিল না তখন ভাইয়া অরণিকে বললেন - তুমি মারুফের পাশে গিয়ে বসো।আজ ও তোমাকে গিটারের বেসিক শেখাবে।
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।অরণি স্বাভাবিকভাবেই আমার পাশে এসে বসলো।আমি বললাম - ভাইয়া, স্কুল আছে
তিনি বললেন- থাকুক,কতক্ষণ বসে থাকবে মেয়েটা?
আমি ওর দিক তাকালাম।চোখ গোল করে আমার দিক তাকিয়ে ছিল ও।ঠিক করলাম প্রথমবার শিক্ষক হচ্ছি।একজনের হতাশা দূর করতে পারলে খারাপ হয় না। আমি নরম গলায় বললাম- আজ প্রথম বুঝি?
অরণি উদাসীন হয়ে মাথা নাড়ল।আমি পরিবেশের সাপেক্ষে বললাম- সমস্যা নেই,প্র্যাকটিস করলেই পারবে।দেখি গিটারটা।
গিটার বের করে সব দেখাতে লাগলাম।কিন্তু অরণি স্কেলিং পারছিলো না।হাত বারবার ডিসপ্লেস হয়ে যাচ্ছিল। ফলে গিটারে সা,রে,গা,মা সুরটা হচ্ছিল না।তখন হুট করে সন্ধি ভাই বলল- ওর হাতটা ঠিক করে দাও
আমার কোনো ইচ্ছাই ছিল না ওর হাত ধরার।যদিও বড় লোভনীয় প্রস্তাব এটা।তবে মেয়েদের বিশেষ ক্ষমতা হল গুজব ছড়ানো।হাত ধরে কোন সমস্যায় পড়ব কে জানে। তবে সন্ধি ভাই ছেলে মেয়েদের দূরত্ব সহ্য করতে পারেন না।উনি চান সব ছেলেমেয়ে যেন বন্ধু হয়ে থাকে।
ভাইয়া একবার এক ছেলে এক মেয়ের পাশে না বসায় ঠাট্ট করেছিলেন
-কি,ওর পাশে বসবে না?
ছেলেটা সহজ গলায় বলল- না
-মেয়েদের পছন্দ না?
-না?
-তাহলে ছেলদের পছন্দ? বড় হয়ে ছেলে বিয়ে করবে?
এইবার ছেলেটা বিব্রত হয়ে গেল
আমি তখন বুঝতে পারছিলাম না হাত ধরব কিনা।পরে মনে হল ধরি।যদি গুজব ছড়ায় তবে এটা আমার দুর্ভাগ্য।
হাত ধরতেই কেমন করতে লাগল।হাতটা খুব নরম এবং ঠাণ্ডা ছিল।ভেবেছিলাম অরণি রাগ করবে,কিন্তু ও উল্টো হেসে দিল।আমি আচমকা বলে ফেললাম- হাসছো কেন?
অরণি স্বাভাবিকভাবে বলল- হাত ধরতে এত ভণিতা কেন? তুমি তো শেখানোর জন্য হাত ধরছো এতে দোষের কি আছে?
-তুমি রাগ করোনি?
-না
বলে অরণি আবার হাসলো। সে হাসি যে স্বস্তির হাসি ছিল তা ভাবতেই ভালো লেগেছিলো।
সেই থেকে অরণির সাথে পরিচয়।ক্লাস টেনে পড়ে।আইডিয়াল স্কুলের ছাত্রী।সৎ বাবা সিমেন্টের ব্যবসা করেন।প্রচন্ড নিরহংকারী একটা মেয়ে। অর্থের দাম্ভিকতা একদমই নেই।
থাকে ইস্কাটনে।
৩
-এই কয়দিন আর লিখছি না।
অরণিকে ম্যাসেজ দিলাম।কথাটা অবশ্য মিথ্যা।আমি আসলে প্রতিদিনই লিখি।এক পাতা,দুই পাতা যাই হোক।কিন্তু অরণিকে সরাসরি বলি না।ইচ্ছা করেই।অরণি তখন মাঝে মাঝে ভাগ্য ভালো হলে ফোন দেয়।এই ফোনের জন্যেই হয়ত আমি এমন করি।
-কেন?
-ভালো লাগে না
-কেন ভালো লাগে না?
-আমি কি জানি?
-সবকিছুরই কারণ থাকে।এটার কারণ কি?
আমি এখন ইচ্ছা করেই ম্যাসেজ দিব না।অরণি তখন পাঁচ মিনিট পর পাঠাবে-কি ব্যাপার? ম্যাসেজের উত্তর দিচ্ছো না কেন?
কয়দিন পরই আমি অরণির সাথে আর কথা বলতে পারব না।কারণ হল রাতুল।রাতুল হয়ত আর দিবে না কথা বলতে।রাতুলদের পরিবার বলতে গেলে বিল গেটসদের মতো।ওর বাবার প্রায় ছয় সাতটা হোটেল। সবগুলোই দশের ভিতরে।সেখান থেকে প্রায়ই কোটি টাকার প্রফিট উঠে। কয়দিন আগে শুনলাম ওর বাবা এখন সিলিন্ডারের বিজনেস করবেন।সেই কারখানা খুলার স্থান হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা।
রাতুল কম নয়। যখনই অরণির সাথে দেখা করতএ আসে তখন দামি গিফট উপহার দেয়। সেসব গিফটিটে লিখা থাকে
happy anniversary
Mr and Mrs Ratul.
আমার মাঝে মাঝে বুঝতে কষ্ট হয় যে রাতুলের এমন কি আছে যে যার জন্য অরণি ওর সাথে আছে।অর্থের প্রতি অরণির বিন্দুমাত্র আকর্ষণ আছে কিনা তা ওর চলাফেরা দেখে বুঝিনি।কিন্তু ও যখন রাতুলের সাথে থাকে তখনই ওর ব্যক্তিত্ব কেমন পাল্টে যায়।তখন সে অরণি আমার কাঙ্ক্ষিত অরণি থাকে না।
-কি ব্যাপার? বল
অরণি আবার ম্যাসেজ দিলো
-অরণি,আমি জানি না।সকল কিছুর কারণ,উদ্দেশ্য থাকে তা জানি,কিন্তু যত আমি লেখালেখির গভীর পর্যায়ে প্রবেশের চেষ্টা করি তখনই বিতাড়িত হই।কেন হই,কি জন্য হই?- তা জানি না।আমার জীবনের অনেককিছুই অজানা।
- কি অজানা তোমার জীবনে?
- এই যে আমার বোনের ব্যাপার।বাবা যেদিন রোড একসিডেন্টে মারা গেলেন সেদিন বাবার সাথে আপাও ছিল। অথচ বাবার ডেডবডি পাওয়া গেলেও আপার ডেডবডি পাওয়া যায়নি।
কিছুক্ষণ পর অরণি লিখল- বোনকে মনে পড়ে?
-মৃত্যুর আগে কেউ আমাকে শেষ ইচ্ছা চাইতে বললে আমি আমার বোনের সাথেই দেখা করতে চাইবো,অরণি
আবার কতক্ষণ কেউ কাউকে ম্যাসেজ দিলাম না।শেষে অরণিই বলল- জানো,রাতুল কি করবে?
-না,কি?
-সামনের মাসে রাতুলের জন্মদিন। তাই রাতুলের বাবা কক্সবাজারে পার্টি দিবেন।কক্সবাজারে ওদের ফাইভ স্টার হোটেল আছে।
-ভালো তো,তোমার মিসেস রাতুল হবার শখ একধাপ এগিয়ে গেল।তোমাদেরও নিবে?
-সৎবাবা আর রাতুলের বাবা একসাথে সিলিন্ডারের ব্যবসা করবেন।ইনভেস্টমেন্টও শেষ।
- পতেঙ্গায় এরকম কারখানা করা ঠিক হবে? গাছপালা,পাহাড়,প্রজাপতি এসব নষ্ট হবে।
- এতকিছু ভাবলে ব্যবসা হয় না মারুফ।কোটি টাকার ইনভেস্টমেন্ট শুধু পাহাড়ের জন্য ঝুঁকিতে যাবে?
- তুমি ব্যবসায়ীদের মতো কথা বলছো,অরণি
- সরি,মাঝে মাঝে তোমার কিছু কথা অসহ্য লাগে।প্রজাপতি থাকে বলে কারখানা করা যাবে না’এটা কোনো কারণ হল?
-প্রজাপতি ভালো লাগে না তোমার?
-না,অসহ্য লাগে।পোকামাকড় ভালো লাগার কি আছে?
-প্রজাপতির প্রতি নরম হও।নইলে পরে ঝামেলা হবে।প্রজাপতি কিন্তু অভিশাপ দিতে পারে।
- এসব ফালতু কথা বলবে না আমার সাথে।
- আচ্ছা বলব না
আবার কিছুক্ষণ বিরতি।তারপর অরণি বলল - আচ্ছা,তোমার না একটা উপন্যাস লেখার ইচ্ছা,মনস্তাত্ত্বিক টাইপের?
-হ্যাঁ,ইচ্ছা আছে।
-লেখা শুরু করোনি?
-না।
-কবের থেকে লেখা শুরু করবে?
-যেদিন আমি খুবই কষ্ট পাব সেদিন।
- কষ্ট পাওয়ার পর লিখতে হবে কেন?
-কারণ তখন লেখার জন্য সব ধরনের অনুপ্রেরণা, উদ্দেশ্য পাবো।
- কিরকম?
- সব প্রশ্ন আজই করবে?
- হ্যাঁ,সমস্যা কি?
-আমারো তোমাকে অনেক প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে, অরণি।
- তাহলে কর।
আমি সামান্য অস্বস্তিতে পড়লকম।প্রশ্ন আসলেই করতে ইচ্ছা করে,কিন্তু ভাবি ঠিক হবে কিনা।কারণ যেসব প্রশ্ন করতে চাই সেসব করার অধিকার লাগে।আমার তা নেই।
-অরণি,আজ যাই।কাজ আছে কিছু।
- আচ্ছা,রাতে কথা বলব।
- রাতেও কথা বলবে?
- হ্যাঁ,কেন? তোমার আপত্তি আছে।
- না,আপত্তি থাকবে কেন? যাই।
অরণি আবার আমাকে অবাক করল। রাতে কথা বলবে ওর প্রিয়মানুষের সাথে। তা না করে কথা বলে আমার সাথে। এটা কি পরীক্ষা? নাকি খোদার দয়া? অন্যের মাধ্যমে দিচ্ছেন? কিছুই বুঝতে পারি না।আসলেই বোধহয় আমার জীবন আমাকে বিতাড়িত করছে।অন্ধ হাতির মতো ভুল পথে যাচ্ছি।কিন্তু তাও জীবন আমাকে রক্ষা করছে না।আমি যেন জীবনের কোনো সংক্রামক রোগ,যা জীবন এন্টিবায়োটিক দিয়ে ধ্বংস করছে।
৪
ডাইনিং টেবিলে বসে আমরা সবাই খাচ্ছি।মামা খাবার নিয়ে এসেছেন।ফখরুদ্দীন এর বিরিয়ানী। বিরিয়ানী খেতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।আজ হালকা কিছু খেতে ইচ্ছা করছিল।ভাত,ডাল আর আমের আচার।এই রান্না কেউ ইচ্ছা করলেই করতে পারত।
আমার মামার নাম মোর্শেদ খান।বড় একটা সফটওয়্যার ফার্মে কাজ করতেন।মাঝখানে হঠাৎ করে চাকরি ছেড়ে দিয়ে নানীকে হাসতে হাসতে বললেন।যেন খুবই সুসংবাদ। নানী হতভম্ব হয়ে বলেছিলেন -চাকরি ছাড়লি কেন?
-সম্মান পাচ্ছিলাম না,তাই।
সেই থেকে মামা বেকার।অবশ্য পুরো বেকার নন।শেয়ারের ব্যবসা ধরেছেন।মামার বয়স ৩৫ এর মতো।এখনো বিয়ে হয়নি।পাত্রী পক্ষের চোখে শেয়ার ব্যবসা কোনো কাজ নয়।তাই তাদের কাছে তিনি বেকার হিসেবেই গণ্য হন।কোনো পাত্রীপক্ষই রাজি হয় না।তবে যারা হয় তারা যৌতুকের মতো অনেক কিছু চেয়ে বসে।যেমন এক পাত্রীপক্ষ রাজি হয়েছিল। পাত্রী ডাক্তার।তাদের শর্ত ছিল পাত্রীকে দুই তলার চেম্বার করে দিতে হবে।সব মেডিকেল ইকুইপমেন্ট এর লেটেস্ট মডেল কেনার খরচ দিতে হবে।
আবার আরেকবার আরেক পাত্রীপক্ষ চাইল পাত্রীকে বিদেশে পাঠানোর সকল টাকা দিতে হবে বিয়ের আগে।সেই থেকে উনি পাত্রী দেখা ছেড়ে দিয়েছেন।অবশ্য বিয়ে নিয়ে এখনো ভাবেন।মাঝে মাঝে যখন মামা রাতে আমার সাথে এসে ঘুমান তখন নিজের গল্প খুবই মুগ্ধকরভাবে করে আমাকে অভিভূত করে ফেলেন
মামা পড়েছেন আহসানউল্লাহর সিএসসিতে।চাকরিটাও ভালো ছিল।হঠাৎ ছেড়ে কেন দিলেন তা মুখ ফুটে কাউকে কখনো বলেননি।সবাই যখন হাজার চেষ্টা করেও জানতে পারলো না তখন আশা ছেড়ে দিল।
মামা মাংস খেতে খেতে বলল - বিরিয়ানী কোক ছাড়া ভালো লাগে না,তাই না মারুফ?
আমি মাথা নাড়লাম
-কোকের কার্বনিক এসিড কিন্তু হজমের জন্য ভালো।এনজাইমগুলা তাড়াতাড়ি কাজ করে।কি সব হজম ক্যান্ডির এড দেখি,সব ফাপ্পাবাজি।জীবনে শুনিনি তেঁতুল খেলে ভালো হজম হয়।
আমি এটা জানি।তাও ভাব করলাম যেন অবাক হচ্ছি।কেউই মামার কথা শুনছে না।মা তো খাচ্ছেনও না। প্লেট নিয়ে বসে আছেন।নানী সামান্য খেয়ে প্লেট সরিয়ে বললেন- তুই রাতে কই যাস,মোর্শেদ?
মামা পানি খেয়ে বললেন - ক্রিকেট খেলতে যাই, মা।কাল জানো,পুরা একা খেলে দলকে জিতিয়েছি।
নানী গম্ভীর হয়ে বললেন- এসবের বয়স আর আছে তোর?
-খেলতে বয়স লাগে না,মা।কাতারের ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেনের বয়স ষাট।
-চাকরির খোঁজ আর করবি না?
- এই বয়সে কে চাকরি দিবে?
- কিছু একটা কর।
- করছি তো,খাচ্ছি,খেলছি,ঘুমোচ্ছি।
নানী ঘন ঘন নিংশ্বাস নিলেন।
মামা বললেন - মা,আর খাওয়ার দরকার নাই তোমার।আমার মনে হয় বিরিয়ানির তেল বেশি থাকায় তোমার গ্যাস হচ্ছে।একটা এন্টাসিড খেয়ে শুয়ে থাকো।
নানী চিৎকার করে বললেন - চুপ থাক,একদম চুপ।
নানী উঠে গেলেন।মামা বললেন - তেল বেশি দিলেই খেতে ভালো হয়েছে,কি বল আপা?
মা শুধু তাকালেন।এরপর তিনিও উঠে গেলেন।
মামা বললেন -দেখলি,এসব জলহস্তি মার্কা রাগের জন্যই সব মরছে।আর আমাকে দেখ,চাকরি নাই,বিয়ে হয় না,টাকার সমস্যা- তাও আমি কত সুখে আছি।
মামা আসলে প্রকাশ করতে চান না তিনি কেমন আছেন।কিন্তু আমি ঠিকই বুঝি।উনি বিন্দুমাত্র সুখে নেই।মামার স্বাস্থ্য আস্তে আস্তে খারাপ হচ্ছে। মামা নিজের বন্ধুদের অবস্থা দেখে সবসময়ই খুশি হন।তিনি কারো খারাপ চান না।মাঝে মাঝে তাকে তার বন্ধুদের বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে দেখেছি।আসলেই এটা কষ্টের যে একটা মানুষের সংসার নেই।মা যে বসে থাকেন তাও না।কয়েক জায়গা থেকে বলা হয়েছিলো চাকরি হয়েছে। কিন্তু যখন জয়েন করতে গেলেন তখন তারা শুনিয়ে দিল যে তারা আসলে ভুল তথ্য দিয়েছে। এখন,এক ব্যক্তির পক্ষে এরকম প্রতারণা আর কত সহ্য করা সম্ভব।তাও মামা যে এখনো এরকম শক্ত আছেন তা আসলেই বিস্ময়কর। সেদিক দিয়ে মামা আমার শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি।
৫
ভালোই লাগে দেখতে স্কুলড্রেস পড়া মেয়েরা ছুটি হওয়ার পর বাইরে এসে হাঁটছে। কেউ ঝালমুড়ি,আচার খাচ্ছে।কেউ কাগজ,কাপড়,জরী দিয়ে বানানো ফুল ফুটপাত থেকে কিনছে।মেয়েদের এই অবাক ক্ষমতা।যেকোনো কিছুরই সৌন্দর্য তারা আগে বুঝে।একটা মেয়েকে দেখলাম রাস্তা থেকে ছোট ছোট রঙিন কিছু কুড়াচ্ছে।ইচ্ছা হল আমিও কুড়াই।মেয়েটা হঠাৎ উঠে হাসতে শুরু করল। খুবই মধুর দৃশ্য।
মতিঝিলে আজ ফুটবল খেলতে আসলাম। ৫টার দিকে ম্যাচ।ত্রিশ মিনিট আগে চলে এসেছি।এও আধ ঘণ্টা ফরহাদ ভাইয়ের বাসায় থাকব।
মতিঝিল কলোনি আমার খুবই প্রিয় জায়গা।আমার জন্ম এখানে।বাবার সাথে প্রায়ই এই এলাকার রাস্তাগুলোয় হাঁটতাম।মাঝে মাঝে বাবা রিকশা করে পুরো কলোনি আমাকে নিয়ে ঘুরতেন।তখন নকশালবাড়ি আন্দোলনের দমন নীতি শুরু হয়েছিল।প্রচুর মানুষকে তখন গুলি করে হত্যা করা হল।কলকাতার রাস্তায় তখন মানুষদের বদলে ছিল বিভিন্ন শ্রেণীগোষ্ঠীর মানুষের রক্ত।আন্দোলনের চারনেতার একজন তখন আত্মহত্যা করলেন,একজন খুন হলেন, বাকি দুজন গ্রেফতার হলেন।এই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত বিপ্লবীরা পরে জঙ্গিবাদে যুক্ত হয়েছিলো।তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী আরো কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে তাদের প্রতিহত করেছিলেন।
মাঝে মাঝে বাবা সেই নকশাল আন্দোলনের গল্প করতেন।যদিও কিছু বুঝতাম না,তবুও ভান করে শুনে যেতাম।এখন আফসোস হয় যে ছোটবেলায় যদি এক অণু পরিমাণ ধৈর্য আমার থাকত,তাইলে হয়ত বাবার মুখভঙ্গি গল্প মনে রাখতে পারতাম।
ফরহাদ ভাইয়া চিনি দুই বছর হল।নটরডেমে সেকেন্ড ইয়ারে পড়েন।ছোটবেলায় বহুবার তাকে দেখলেও কখনো কথা হয়নি।পূর্বে স্কুল আর বাসার মাঝেই তার যাতায়াত সীমাবদ্ধ ছিল।তার সাথে পরিচয় ভাগ্যের সুবাধে।চেনার পর থেকেই আমাদের মাঝে এক ধরনের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি হল।ইংরেজিতে যা বলে” the brother I never had” তেমন।আমি আগে ভাবতাম উনি চার দেয়ালের মানুষ,কিন্তু পরে দেখলাম না।খেলাধুলা,সাহিত্য,বিজ্ঞান- সবকিছুতেই উনি স্বাচ্ছন্দ্য। ওনার স্বভাব হল এই ফুটবল ম্যাচ খেলা।কোন সব জায়গা থেকে উনি দল খুঁজে নিয়ে কলোনির মাঠে টুর্নামেন্ট খেলেন। তার গড়া দলে আমি আর কলোনির কিছু ছেলে থাকে। তাদের সাথে ছোটবেলায় একসাথে বড় হয়েছে।তবে জেতার চেয়ে আমাদের হারার রেকর্ড বেশি।তাও তিনি নিরাশ হন না
-আয় ঘরে আয়।
ফরহাদ ভাইয়ের পরনে সুতির পায়জামা আর একটা গেঞ্জি।হাতে কলম দেখে বুঝলাম পড়ছিলেন।উনি মাঝে মাঝে সেল্ফ স্টাডি করেন।এখন হয়ত সে সময়।
আমি গিয়ে আহত গলায় বললাম- ফরহাদ ভাই,এতদিন পর এলাম,আসেন না গল্প করি।
ফরহাদ ভাই হেসে বললেন- আচ্ছা,যা খাটে বোস।
ফরহাদ ভাই উঠে ভিতরের ঘরে চলে গেলেন।আমি খাটে পা উঠিয়ে বসলান।ফরহাদ ভাইয়ের শেলফে প্রচুর বই।দেখতেই ভালো লাগে।আজ ঠিক করলাম জেফরি আর্চারের “ only time will tell” বইটা আবার নিব।কারণ এমা ক্লিফটন।আমার প্রিয় চরিত্র। মনে আছে সপ্তম সিরিজ “ this was a man” বই এ ওর মৃত্যুর গল্প পড়ে সারাদিন কেঁদেছিলাম। এখনো ভাবলে চোখে পানি আসে।
ফরহাদ ভাই মিষ্টি নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।আমি জিজ্ঞাসা করলাম- মিষ্টি কেন?
-নাফিসা ক্যাডেটে টিকসে।সেটার মিষ্টি।
- বাচ্চা মেয়ে ক্যাডেটে পড়বে?
- বাচ্চা কই,ক্লাস সেভেনে এখন।
- কত ছোট ছিল।বোনকে সময় দেন নাকি নিজের মতো থাকেন? কয়দিন পর তো তেমন দেখার সুযোগ পাবেন না।
- সময় দেওয়ার কি আছে?
- চলে যাওয়ার সময় তো ঠিকই কান্নাকাটি করবেন।
ফরহাদ ভাই এবার চুপসে গিয়ে বললেন - চুপ কর তো,মিষ্টি খা
-আপনিও খান।
দুইজন মিষ্টি খেতে লাগলাম।রসের মিষ্টি ভালোই লাগে।ফরহাদ ভাই মিষ্টিমুখে বললেন- তোর কি অবস্থা বল
আমি আরেকটা মিষ্টি নিয়ে বললাম- ভালো।
-আর ওর খবর কি?
-কার?
-বুঝেও না বুঝার ভান কেন করিস?
আমি চুপ হয়ে গেলাম এই বিষয় নিয়ে কথা বলতে আমার ভালো লাগে না।
-”অরণি ভালো আছে” পানির গ্লাস নিয়ে বললাম।
-ও ভালো তো থাকবেই। এসব মেয়ে প্রতারণা করে সুখে থাকে।
-হয়ত।
- ওর কাছ থেকে দূরে থাক।নইলে পরে সমস্যায় পড়বি।
আমি বললাম- ফরহাদ ভাই,আমি চেষ্টা করছি।কিন্তু লাভ হয় না।গিটার ক্লাসে সবসময় দেখা হয়।বিভিন্ন উল্টাপাল্টা কথা ওকে বলেও লাভ হয়নি।
ফরহাদ ভাই ঝিম ধরে বললেন- তাহলে এবার উল্টাপাল্টা গল্প বল।
-বুঝলাম না।
-দাঁড়া বুঝাই,ওকে প্রশ্ন করবি পাতা ঝরে কই পড়ে?
আমি অবাক হয়ে বললাম- কই পড়বে? মাটিতে।
-দূর গাধা,জিজ্ঞাসা করবি প্রথমে,ঠিক আছে?
-হু।
-ধর বলল মাটিতে।তুই তখন বলবি”না,পড়ল এক ফকিরের হাতে……..
এই গল্প শুনে যদিও হেসে ফেললাম,তবে প্রচন্ড ঘৃণিত লাগল।
হঠাৎ মনটা সামান্য ভারি হয়ে উঠল।আমি ফরহাদ ভাইকে বললাম- ভাই,ওর সাথে কথা বলে আমি কষ্ট পাই ঠিক।কিন্তু এই কষ্টই যে আমার অবলম্বন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ফরহাদ ভাই এসে কাঁধ ধরে বললেন- এই কষ্ট গ্রহণ করার সময় এখন না,মারুফ।মনে রাখবি এক নারীর চেয়ে নিজের জীবনের মূল্য অনেক।
আমি মাথা নাড়লেও কথাটায় একমত হতে পারলাম না।
৬
ম্যাচ শেষ হয়েছে ৩০ মিনিট আগে।সবদিনের মতো আমরা দুই-এক গোলে হেরেছি।ফরহাদ ভাই খেলার পর সেই প্রথামত সান্ত্বনা দিলেন।আমি খেলেছি ডিফেন্সে।আজ ডিফেনশ করতে গিয়ে লাথি খেয়ে বাম পায়ের নিচের অংশ ফুলে গেছে। অন্যসময় দৌড়ে এক লাফে বাসে উঠে বাড্ডা চলে যাই।আজ দৌড়ে যেতে না পারায় বাস মিস করেছি। পকেটে মাত্র ৫০-৬০ টাকার মতো আছে।তাই সিএনজিও ঠিক করতে পারছি না। বাসায় বলে আসিনি যে আমি মতিঝিলে যাব।মা মতিঝিলে আসেন না ৫ বছর হল।
ফয়জুর রহমান স্কুলের সামনে আসার পরই পায়ের ব্যাথা খুবই বেড়ে গেল।মনে হল পা ভেঙ্গে আছে।তবুও হাঁটতে খারাপ লাগছে না।কারণ আবহাওয়াটা দারুণ।ঠান্ডা বাতাস হচ্ছে।কালো আকাশ আস্তে আস্তে লাল বর্ণে রূপ নিয়ে একটা ভৌতিক ভাব তৈরি করছে।চারপাশে কেমন মাটি মাটি গন্ধ।খিলগাঁতে বৃষ্টি হলে চমৎকার পানি জমে রাস্তায়। জ্যামও বাড়ে।হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম মার্কেটের সামনে একটু ভিড় জমেছে। তবে আস্তে আস্তে তার ঘনত্ব বাড়ছে।আমার সামান্য কৌতূহল হল।হয়ত কোনো সাপের খেলা অথবা বানরের নাচ দেখানো হচ্ছে।ঢাকায় এই আধুনিক যুগে এসব কোথাও কোথাও দেখিয়ে মানুষ এখনো আয় করে।এটা খুবই বিস্ময়কর। আমার অবশ্য সাপের খেলার মধ্যে আগ্রহ নেই।সাপ হাতে নিয়ে গান গাওয়ার মধ্যে আমি কোনো বিনোদন খুঁজে পাই না।ওদিকে ভিড় বেড়েই চলছে।হঠাৎ তীব্র শব্দে হাততালি বেজে উঠল।দেখে ভালো লাগল যে এদের বৃষ্টি নিয়ে কোনো ভাবনা নেই।বৃষ্টির হাত থেকে তারা পালাতে চায় না।বরং বৃষ্টির আহবানেই এরা আনন্দ ভোগ করতে এসেছে।আমিও ভিড়ের মধ্যে ঢুকে গেলাম।দেখলাম প্যান্ট আর ক্রীম কালারের শার্ট পড়া এক ভদ্রলোক।গায়ের রং শ্যামলা।মাথায় এক বিরাট টাক।বয়স ৩৫ এর মতো।হাতে স্টীলের চামচ।চামচ হাতে উনি বলতে লাগলেন- প্রিয় সন্দেহভাজন বন্ধুরা,বুঝাই যাচ্ছে আপনারা বিরক্ত।আপনারা হয়ত ভাবছেন যে আমি সেই ম্যাজিক দেখাব যেখানে দুইহাত দিয়ে চামচ ধরে এমনভাবে হাত বাঁকানো হয় যে দেখে মনে হয় চামচটা ভেঙ্গে গেছে।আসলে আমরা জানি যে সেটা বড় ধরনের একটা ফাঁকি।অবশ্য ম্যাজিক মানেই ফাঁকি।তবে আমি আপনাদের ফাঁকি দিব না।আমি আপনাদের চোখের সামনেই চামচটা বাঁকা করব।না,বাঁকা নয়- বলে ভদ্রলোক সামান্য হাসলেন এবং ইংরেজিতে বললেন- let's make it a little more interesting।
আমি অবাক হলাম সামান্য।বাংলাদেশে যারা রাস্তাঘাটে ম্যাজিক দেখিয়ে বেড়ায় তাদের বেশিরভাগই অশিক্ষিত হয়ে থাকে।ম্যাজিকও হয় খুব নিম্নমানের।বেশিরভাগই দেখায় দড়ির ম্যাজিক।সেসব দেখাতে গিয়েও তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না।ফলে কোনো সাসপেন্স থাকে না।আবার বাংলাদেশে ম্যাজিক শেখাবারও কোনো প্রতিষ্ঠান নেই।
ভদ্রলোক এবার এক কাজ করলেন।উনি একটা কাগজ বের করে সবাইকে বলতে লাগলেন - ম্যাজিক কিছুই না।শুধু বিভ্রম।আশ্চর্য এক বেড়াজাল।যারা আঘাত সবাইকে গ্রাস করবেই।যদি তা এড়াতে চান তবে চোখের পলক ফেলবেন না।you blink,you miss.
এবার কাগজ দিয়ে কলম ঢাকতে ঢাকতে বললেন- আমি এখন আপনাদের মধ্য থেকে একজনকে সামনে আনব।তার সামনে কাগজ দিয়ে চামচটা ভাঙব।যদি তার পছন্দ না হয় তবে সে যতক্ষণ এখানে থাকবে তার জন্য মিনিট প্রতি দশ টাকা করে দিব। so,who wants to be my volunteer?
ভিড়ের মধ্যে তীব্র চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেল।আমি ভাবছি ম্যাজিশিয়ান ঠিকই বলেছেন।ম্যাজিক মানেই বিভ্রম। কোনো এক অজানা বিদ্রোহী,যার হাত হতে নিষ্পত্তি পাবার একমাত্র উপায় পালক না ফেলা।এরা পলক ফেলেছে দেখেই এই অবস্থা।
৭
ম্যাজিশিয়ান সাহেব শেষে কাগজ দিয়ে আসলেই চামচ বাঁকা করিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন।আবার ভিড়ের মধ্যে থেকে একজনকে আনলেন।ভদ্রলোক কফি খাচ্ছিলেন।ম্যাজিশিয়ান তখন ভদ্রলোকের প্রিয় মানুষের কথা ভাবতে বললেন।এরপর কফির কাপ নিয়ে উপরটা রুমাল দিয়ে কতক্ষণ ঢেকে রাখার পর যখন রুমালটা সরালেন তখন সবাই দেখল যে কফির ফোম দিয়ে এক নারীর চেহারা চেহারা সৃষ্টি হচ্ছে।পরে জানা গেল ইনি ভদ্রলোকের স্ত্রী।আরো ম্যাজিক হয়ত তিনি দেখাতেন কিন্তু তখনই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল।ভেবেছিলাম কেউ পালাবে না।কিন্তু ধারণা ভুল।বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা মাটিতে পড়তেই সবাই যুদ্ধে পরাজিত সৈনিকদের মতো পালিয়ে গেল।ম্যাজিশিয়ান সাহেবের সাথে আমার আর কথা বলা হল না।
বাড্ডার সব রাস্তা বৃষ্টির জন্য কাদা কাদা হয়ে গেছে।আমার বাসা পাঁচতলা গলির ভিতর। বাড্ডার প্রথম বিল্ডিং ছিল পাঁচতলা সেই থেকে গলির নাম পাঁচতলা বিল্ডিং।পাঁচতলা বিল্ডিংটা অবশ্য বহু আগেই ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।তবে গলি আর গলির নাম ঠিকই আছে।
গলির রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ।।বৃষ্টির হলে প্রচুর পানি জমে।তখন রাস্তা দিয়ে গাড়ি,রিকশা চলতে পারে না। রাস্তায় দুই তিনটা ম্যানহোল আছে যেগুলোর ঢাকনা নেই।প্রায়ই বৃষ্টির পর ঐ রাস্তা দিয়ে গাড়ি,রিকশা চলতে গেলে চাকা ম্যানহোলে পড়ে দূর্ঘটনা ঘটে।তীব্র জট হয়।তাও করপোরেশন রাস্তা ঠিক করে না।মাঝখানে রাস্তা ঠিক করতে কিছু ভাঙা ইট ফেলা হয়েছিল। ওতদূরই,এরপই সব লাপাত্তা।তবে সাইনবোর্ডটা এখনো আছে।হাঁটে গেলে এখনো চোখে পড়ে
সাময়িক সমস্যার জন্য
খুবই দুঃখিত
কর্তৃপক্ষ
আমার পুরা শরীর ভেজা খুবই ঠান্ডা লাগছে। প্যান্টে কাদা লেগে একাকার।এক হাঁটু পরিমাণ পানির মধ্যে দৌড় দেওয়া যায় না।তাই আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগলাম।এমনিতেই দেরি হয়ে গিয়েছে।এখন তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কোনো দূর্ঘটনা ঘটানোর কোনো মানে হয় না।নিজেকে খুবই চিন্তামুক্ত লাগছে।মা যে ধমক দিবে সেটা আমাকে বিচলিত করছে না।বরং আরো দেরি করে বাসায় যেতে ইচ্ছা করল। আমার মেজাজ ভালো থাকলে এমনিতেই মুখে গান চলে আসে।গুণগুণ করে গাইতে লাগলাম -
বসে আমি একা
কাঁচা রোদ বিকেল উদাস
বৃষ্টি শেষে রূপালি আকাশ,
মেঘে জানালাতে
ঝিলমিল সোনালি আভায়
ঝিরঝির বয় হিমেল বাতাস,
সোনালি আভায় সাথে ফিরি
আমি মেঘে মেঘান্তরে
হিমেল বাতাসে ডানা মেলি
আমি দূরে দূরান্তরে।
বাসার বড় গেট দেখলাম খোলা।কখনোই খোলা থাকে না।ভালো হল।চুপিচুপি বাসায় ঢুকে যাব।সমস্যা হল বারান্দায় কোনো বাতি নেই।তাই উঠান অন্ধকার। বৃষ্টির পর শ্যাওলা জমে উঠান পিচ্ছিল হয়ে যায়।ছোটবেলায় একবার আছাড় খেয়ে মাথা ফাটিয়ে ফেলেছিলাম।আশেপাশের সব বিল্ডিং এর জানালা বন্ধ।ভাবতেই অবাক লাগে আগে এসব জায়গায় খাল বিল ছিল।সেখান থেকে বস্তি। তারপর গোয়ালঘর।সেখান থেকে সিটি করপোরেশনের কর্মচারীদের জন্য বিল্ডিং।
আমি ঢুকে আস্তে গেটটা লাগিয়ে দিলাম।খুবই অন্ধকার।ফলে গাছের পাতাগুলা কালো কালো লাগছে।পাতার মধ্যে জমা পানি গায়ে পড়তে লাগল।হাঁটতে গিয়েই স্লিপ খেলাম।তবে স্লিপ খাওয়ার পর পায়ে কি যেন ঠেকল। কি ঠেকল বুঝলাম না।হাত দিয়ে উঠাবো কিনা তাও ঠিক করতে পারলাম না।শেষে ঘরে ঢুকতে যাব তখন দেখলাম ঘরে পুলিশ এসেছে।বাসায় কাচের সব জিনিসপত্র ভাঙা অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে।জানালার গ্লাস ভাঙা।নানী হাঁপাচ্ছেন। মা পুলিশ ইন্সপেক্টর এর সাথে কথা বলছিলেন। খালামণি ভাঙা জিনিসপত্র উঠাচ্ছেন।আমি থমকে গেলাম।একী অবস্থা! খালামণি আমাকে দেখে ছুটে আসলেন।এসে জড়িয়ে ধরলেন।এতে ওনার গায়েও কাদা লেগে গেল।খালামণি জিজ্ঞাসা করলেন- কই ছিলি,মারুফ?
-খেলতে গিয়েছিলাম।তাড়াতাড়িই আসতাম কিন্তু….
-আর কিছু বলতে হবে না।ঘরে গিয়া হাত পা ধুয়ে নেয়।এরপর কাপড় পালটা।আর ঘরে তো কাচ,স্যান্ডেল নিয়েই ঢুকে যা।
আমি টাওয়েল নিয়ে মামার ঘরে ঢুকে দেখলাম আমার সব বই পত্র, জামাকাপড়, মামার কম্পিউটার, টেবিল ভেঙে ফেলা হয়েছে।মামার ড্রয়ার কেউ ঘাটাঘাটি করেছে। সব কাগজপত্র ছেঁড়া।আমি হতবাক হয়ে গেলাম।আমার ফোনটাও নিচে পড়ে আছে।তুলে নিয়ে দেখলাম শুধু স্ক্রিন ভেঙেছে।ফোবে দুইটা মিসকল। অরণি দিয়েছিল। এমন সময় মা ঘরে ঢুকে বললেন- মারুফ, পুলিশ তোর সাথে কথা বলতে চায়।
৮
ইন্সপেক্টর এর বয়স পঞ্চাশ এর মতো হবে।গায়ের রং ফর্সা।তবে মাথায় একটুও চুল নেই। মুখে অনেক দাগ।আশেপাশে আবহাওয়া ঠান্ডা থাকা সত্ত্বেও উনি ঘামছেন।ওনার ডান হাতের দুই আঙ্গুলের মাঝে গাঢ় কালো দাগ।চেইন স্মোকারদের এমন দাগ থাকে আঙ্গুলের মাঝে।বার বাত কেউ ফোন দিচ্ছে তাকে।আমার সামনেই ধরে বললেন- কি বললে,দুলাল? ধর্ষণ ঘটেছে? বয়স? এত কম? আচ্ছা আসছি, বললাম তো আসছি।ভিক্টিমকে হসপিটালে পাঠাও।
ফোন রেখে উনি আমার দিকে তাকালেন।ওনার ভুঁরু কুঁচকে গেল।মনে হল আমাকে সন্দেহ করছেন।আমাকে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করলেন- মোর্শেদ খান তোমার কি হয়?
-মামা।
-ওনাকে কয়বছর ধরে চিনো?
এই প্রশ্নটা বুঝলাম না।আপন মামাদের কয়বছর ধরে চিনতে হয়?মামার সাথে ছোটবেলার থেকেই আমার সখ্য
-আপনার প্রশ্ন বুঝলাম না।
-ওনাকে কয়বছর ধরে চিনো?
-আপনি আপনার আপন খালাকে কয়বছর ধরে চিনেন?
খুবই অবাক হলাম এই কথা বলে।ঝোঁকের মাথায় যা এসেছে মাথায় অকপটে বলে ফেলেছি।ইন্সপেক্টর দেখলাম কেমন হকচকিয়ে গেলেন।দুইজন কনস্টেবল দাঁড়ানো তারা মুচকি মুচকি হাসছে।মা বললেন- মারুফ,ঠিক করে কথা বল।
ইন্সপেক্টর এবার নড়েচড়ে বসে জিজ্ঞাসা করলেন- সারাদিন কই ছিলে?
-মতিঝিল।
- আজ একবারো তোমার মামার সাথে দেখা হয়েছে?
-না।
-ওনার কোনো বন্ধু এই এলাকায় থাকেন?
- জ্বী দুইজন
ইন্সপেক্টর মার সেটমেন্ট মেলালেন।দেখলেন ঠিক আছে।
-মামার সাথে তোমার কেমন কথাবার্তা হয়?
-অনেক।মামা প্রতিরাতেই আমাকে বিভিন্ন গল্প বলেন।
-যেমন?
-শেয়ারের গল্প,ক্রিকেটের গল্প।
-আর কিছু?
-না।আর কিছু না।
-আচ্ছা যাও।।
ইন্সপেক্টর কেমন চুপসে গেলেন।এরপর দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন- ঘরের কোনো কিছুই তারা নিলো না।শুধু মোর্শেদ সাহেবের ঘর থেকে তারা ডাকাতি করল।এটা কিভাবে সম্ভব? নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে।
নানী রাগী গলায় বললেন-আপনি আমার ছেলেকে সন্দেহ করছেন?
-করা অস্বাভাবিক?
-আমার ছেলে জীবনেও এমন কাজে জড়িত থাকবে না।
-সেটা পরে বুঝা যাবে।মোর্শেদ সাহেব আসলে থানায় যেতে বলবেন।আপনারাও আসবেন।কাল লিখিত স্টেটমেন্ট নিব।আর জিডি করবেন কাল।আশেপাশের কেউ কিছু জানে এ নিয়ে?
-ঝড়ের মধ্যে ঘটেছে। কারো বুঝার কথা না।
ইন্সপেক্টর খুশি হয়ে বললেন- খুব ভালো
নানী চিৎকার করে বললেন- আমার বাড়িতে ডাকাত এসে ভাঙচুর করেছে।কেউ জানতেও পারল না যে সাহায্য করবে।আর আপনি বলছেন এটা ভালো?
নানী রাগে ফুঁসতে লাগলেন।মা তাড়াতাড়ি নানীকে এসে ধরলেন।
ইন্সপেক্টর বললেন -আহা! কথা তো শুনে নিন।বলেছি কারণ এখন সাংবাদিকরা আশেপাশের মানুষের কাছ থেকে তেমন তথ্য নিয়ে পত্রিকায় কিছু লিখতে পারবে না।বুঝেন তো, পুরো মিডিয়াই খালি পুলিশের পাছায় বাঁশ ঢুকাতে চায়।কয়দিন আগে কি নিউজ দিলো দেখেছেন না? বাংলাদেশের পুলিশ বলে জনগণদের সন্ত্রাসীদের চেয়ে বেশি হেনেস্তা করে।আরে খানকিরা,হেনেস্তা না করে উপায় আছে? একটা সৎ পুলিশ ইন্সপেক্টরের ইনকাম মাগিরা জানে……….
ইন্সপেক্টর সাহেব সাংবাদিকদের নিয়ে তার মহান লেকচার আরো ছয় মিনিট দিলেন।এর মধ্যে যা যা গালি দিলেন তা খালামণি সহ্য করতে না পেরে তার কানগুলো হাত দিয়ে চেপে ধরলেন।
কথা শেষে ইন্সপেক্টর গেটের কাছে এসে জুতা পড়তে লাগলেন।সেই সময়ে বললেন - কোনো সাংবাদিক আসলে তেমন কিছুই বলবেন না।ভুলেও পুলিশের উপর দোষারোপ করবেন না।
তারপর কনস্টেবলকে বললেন - হাশেম,লাইট জ্বালাও তোমার ফোনের।
হাঁটতে গিয়ে ওনার পায়ে কি যেন ঠেকল।উনি বিরক্ত হয়ে বললেন - কি এটা? দেখ তো।
কনস্টেবল বলল - স্যার,এটা লাল মলাটের একটা ডায়েরি।
আমি চমকে উঠলাম। আমার কবিতার ডায়েরি ওটা।আমি চিৎকার করে বললাম- আমার ডায়েরি ওটা।
বলে দৌড়ে বের হয়ে গেলাম।
ইইন্সপেক্টর সাহেব হেসে ডায়েরি ফেরত দিয়ে বললেন- ছোট সাহেব,মেয়েদের যখন ঐসব বড় হয় আর ঐ জায়গা দিয়ে ঐসব পড়ে তখন তারা ডায়েরি লিখে।বুঝেছো?
আমি মার দিক তাকালাম।তিনি মুখ নামিয়ে ফেললেন।পুলিশ উঠান পেরিয়ে চলে গেল।ঘরে ঢুকে দেখলাম ডায়েরির কিছু পেইজ ছাড়া বাকিসব প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে।নষ্ট না হওয়া একটা পেইজের মধ্যে দেখলাম লেখা-
আমার দুয়ারে ঝুলছে তালা
মধুর বুলিতে ভাসে বনফুলের মালা
কার কৈফিয়ত তার করে চুরি?
এটাই স্বপ্ন
ওপারে বাস করে মৃত অনুসারী।
আমি অবাক না হয়ে পারলাম না।কারণ হাতের লেখাটা মামার।
৯
প্রায় একমাস হয়ে গেল।এই একমাস ধরে মামা সেই ডাকাতি হওয়ার দিন থেকেই নিখোঁজ। মামা নিখোঁজ হবার পর থেকে আরো একা একা লাগে।মামার লেখাগুলি আমি এখন প্রতিদিনই পড়ি।পড়তে গিয়ে চোখে পানি চলে আসে।তখন বুকে জড়িয়ে ধরি পাতাগুলো।
পুলিশ একমাস ধরে তদন্ত করছে এটা নিয়ে।তবে ইন্সপেক্টর জামাল বারবার সন্দেহ করছেন মামাকে।শুধু মামার ঘরেই ডাকাতি আর ডাকাতি হওয়ার দিনই মামার নিখোঁজ হওয়া- এই দুই যুক্তিই মামার বিরুদ্ধে শক্ত সন্দেহ স্থাপন করেছে।এতে সামান্য বিরূপ মনোভাব শুরু হলেও নানীর ধারণা এখনো ভাঙেনি।মামা ছিলেন একমাত্র ছেলে।নিজের একমাত্র ছেলের প্রতি মাদের অন্যতম একটা টান থাকে।এই টান পিতামাতার নিজের বড় সন্তানের প্রতি যে মমতা থাকে তার চেয়েও শক্তিশালী। আমার প্রতি মায়ের টান আমি মাঝে মাঝে উপলব্ধি করি।মামার নিখোঁজ হওয়ার প্রভাব আমাদের উপর পড়েছে শুধু মানসিকতার দিক দিয়ে।আগে যেমন পুরুষরাই শুধু উপার্জন করত এবং তাদের প্রভাব আর্থিক থেকে মানসিক - সব দিকেই থাকত এখন আর তা নেই।মা, খালামণি দুইজনই চাকরি করেন।নানী পেনশনের টাকা পান।তাই মামার অনুপস্থিতি কোনো আর্থিক প্রতিকূলতা ডেকে আনতে পারেনি।নানী এই কয়দিন কেমন জানি হয়ে গেছেন।রাতে ঘুমোন না।সারাদিন নামায,কুরআন পড়েন।এই যুগেও তিনি মসজিদের হুজুরের কাছ থেকে তাবিজ এনে মাটিতে পুঁতে রেখেছেন।এখনো খাবার টেবিলে মাঝে মাঝে বলেন - মোর্শেদ আসেনি?
মামার ঘরটা এখন পুরোপুরি আমার। মা নতুন করে সবকিছু গুছিয়ে দিলেও মামার চিহ্ন অবশ্য মুছে ফেলেননি।মামার টেবিল এখন আমার।আগে কবিতা লিখতাম লুকিয়ে লুকিয়ে যাতে মামা না বুঝতে পারেন।তাও মামা ঠিকই ডায়েরি খুজে বের করতেন।তারপর লেখা কবিতা পড়ে তার সমালোচনা লিখে আমার সাথে ঠাট্টা করতেন।তিনি সমালোচনা সাধু ভাষায় লিখতে পছন্দ করতেন।যদিও তা পুরো সাধুভাষা হত না।তবে পড়তে ভালো লাগত।তিনি লিখতেন-
হে বংশের বাতি মারুফ,
আপনার কবিতাখানি পড়িয়াছি।আপনি খালি গদ্যছন্দে লিখিয়া কি আনন্দ খুঁজিয়া পান তা বুঝিতে পারিনে।তবুও এখনো কাব্যপ্রতিভার উন্মোচন হয়নি এমন কবিকে স্বাধীনতা দান করিলাম। রবীন্দ্রনাথের পুনিশ্চ কাব্যগ্রন্থ অধ্যয়ন শুরু করিয়া দিন।সাথে আরো একখানা উপদেশ দিয়া পত্র শেষ করিব।তা হল দয়া করিয়া বিছানার নিচে ডায়েরি লুকাইবেন না।ইহা নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেয়।
মোর্শেদ খান।
সমালোচনামূলক পত্রগুলো এখনো আছে।আগে বিরক্ত লাগলেও এখন ভালো লাগে খুবই।জগতের এই হল নিয়ম।তুচ্ছ বস্তু যে কখন শতাব্দীর নিদর্শন হয়ে যাবে তা কেউ জানে না।যেমন- রাজা বাদশাদের খাবার প্লেট জুতা, হেরেম।য়ারা কখনই জানতো না যে তাদের সামান্য পানি খাবার গ্লাস একদিন তাদের আভিজাত্যের পরিচয় তুলে ধরবে।
ইন্সপেক্টর জামাল হুঁশিয়ার করেছিলেন যে সাংবাদিক আসবে।আমরা বিশ্বাস করিনি।কারণ ডাকাতি কিভাবে,কখন হল তা আমাদের প্রতিবেশিরা ঠিকভাবে জানে না।খালি জানে যে মামা নিখোঁজ। কিছু প্রতিবেশি এসে নানীকে সান্ত্বনা দেয়।একদিন আসলেই সাংবাদিক আসলো।প্রথমবার আসলো একজন ফ্রিল্যান্সার। বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সারদের কোনো সম্মানই নেই। ভদ্রলোক আবার খুব লাজুক ছিলেন।বয়স হবে ২৫ এর মতো।পরনের শার্ট ময়লা আর ছেঁড়া ছিল। দুইটা প্রশ্ন করার পরই নানী চিৎকার করে বললেন- আপনি বের হন।কলমই ধরতে পারে না, আবার আমার ছেলেকে নিয়ে লিখবে,বের হন।
ভদ্রলোক মাথা হেঁট করে চলে গেলেন।খুবই খারাপ লেগেছিলো সেদিন।কি দরকার ছিল এভাবে অপমান করার।
একদিন সত্যিই একজন আসল সাংবাদিক আসলো।গায়ের রঙ শ্যামলা।উচ্চতা পাঁচ ফুট কয় ইঞ্চির মতো হবে। পরনে ছিল সুতির ক্রীম শার্ট আর জিনসের প্যান্ট।প্রশ্ন করেছিলেন মাত্র পাঁচ ছয়টা।ছিলেনও ১০-১৫ মিনিটের মতো।ওনার কথাবলার ঢং,কলম ধিরার নিয়ম,মুখভঙ্গি দেখে খুবই মুগ্ধ হয়েছিলাম।ঐদিন মনে হল, কে বলেছে সাংবাদিকরা অপদার্থ।মাঝখানে খেয়াল করলাম উনি কথার ফাঁকে ফাঁকে খালামণির দিক বার বার তাকাচ্ছেন।খালামণিও চোখ নামাচ্ছেন না।হঠাৎ খালামণির মুখে হাসির আভাস পেলাম।বহুদিন ওনাকে হাসতে দেখিনি।
পরের দিনই প্রথম আলো পত্রিকায় আমাদের নিয়ে প্রতিবেদিন বের হল।প্রতিবেদকের নাম জাহিদ হাসান।সামান্য কয়টা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যে উনি এমন প্রতিবেদন লিখবেন তা ভাবতেও পারিনি।পুরা ঘটনা আর পুলিশের তদন্তের মন্থরগতির উনি তীব্র সমালোচলা আর জামাল সাহেবের কাজের প্রতি শারীরিক নির্যাতনের পুরা ঘটনা উনি প্রতিবেদনে লিখেছিলেন।আমরা তখন বুঝলাম পুলিশ আর আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে না।
১০
ঐদিনগুলির ঘটনার পর থেকে স্কুলেও আমার প্রতি এক ধরনের সহমর্মিতা জন্মিয়েছে সবার।স্যাররাও এখন প্রতিদিনই আমার খোঁজ নেন।প্রথম আলোর সেই সাংবাদিকের জন্যেই আমার উপর সবার এত মমতা।ঐদিনের দশ মিনিটের ইন্টারভিউতে শুধু জিজ্ঞাসা করেছিলেন মামার সাথে ঘনিষ্ঠতা কেমন ছিল।ঐ এক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যে এতকিছু লিখে ফেলবেন তা ভাবতেও পারিনি।এমনকিছু কথা লিখেছেন সেগুলোর কারণও ধরতে পারিনি।যেমন ঘুমের মধ্যে মামা বলে উঠা।আমি এমন জীবনেও করি না। আবার মামা যেদিন নিখোঁজ হলেন সেদিন থেকে বলে আমি তিনদিন না খাওয়া ছিলাম-এসবও মিথ্যা। তবে এসব মিথ্যা আমাকে সবার সামনে এক মহৎ ব্যক্তিত্বের ছেলে বানিয়ে দিয়েছে।স্যাররাও এখন আমার প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল। কেউই আমাকে তেমন শাসন করেন না।এমনকি জব্বার স্যারও না।জব্বার স্যারকে আমরা পিছনে “জল্লাদ” ডাকি। মার দেওয়ার ব্যাপারে ছেলে মেয়েদের মাঝে উনি কোনো বৈষম্য করেন না।আইডিয়াল স্কুলে তিনিই একমাত্র মার দেওয়ার ব্যাপারে সাম্যবাদী।
তবে ক্লাসে আমার কারণে ওনেক ভোগান্তির মধ্যেও পড়তে হচ্ছে।এই যেমন কেউ যদি হোমওয়ার্ক না করর তখন কারণ হিসেবে বলে-”বাসায় ডাকাতি হয়েছিল”।স্যারেরা তখন বিভ্রান্ত হয়ে যান।আবার ক্লাসে কোনো স্যার ঢুকতে গেলেই চিৎকার করে উঠা-”ডাকাত,ডাকাত”।এসব দেখে খুবই খারাপ লাগে।আবার কিছু ছেলে আছে যারা সারাদিন আমার পেছন লেগে থাকে।একবার এক ছেলে এসে বলল- মারুফ,তোর মামা বলে মাগী পাচার করতে গিয়ে ক্রসফায়ারে মারা গিয়েছে?
বলার পর ঐ ছেলে আর তার বন্ধুরা হাসতে থাকে।আমার তখন মাথা হেঁট করে বসে থাকা ছাড়া আর উপায় থাকে না।কারণ যদি বলি মামা নিদোর্ষ,তবে ওরা কথা ছড়াবে।আর যদি ওদের সমর্থন করি,তখন আমাদের পরিবারের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। এভাবেই দিনকাল কাটছে।
আমি গার্জিয়ানদের জন্য বানানো স্কুল সিটিংয়ে বসে আছি। মেয়েদের শিফট এখনো ছুটি হয়নি।আরো দশ মিনিট বাকি।আমি ইচ্ছা করেই আজ আগে চলে এসেছি।কারণ নানীর অবস্থা সকাল থেকে খারাপ।কাউকে চিনতে পারছেন না।মা আর খালামণিকে দেখে বারবার চিৎকার করে বলছিলেন- আমার ছেলেকে কি করেছিস তোরা? আমার ছেলে কোথায়? তোরা কারা?
এই অবস্থায় ওভাবে লুকিয়ে চলে আসা উচিত হয়নি।প্রচণ্ড ক্ষিধাও লেগেছে। অথচ কিছু কিবে খেতে ইচ্ছা করছে না। স্কুলের সামনে এক ভদ্রলোক ঝালমুড়ি বিক্রি করে। আগে প্রত্যেকদিনই তার কাছ থেকে এসব কিনে খেতাম।হঠাৎ একদিন আমাদের স্কুলের ক্লাস টু এর এক ছেলে এইডস হয়ে মারা গেল।সেই ছেলে বলে ঝালমুড়ির কাছ থেকে ঝালমুড়ি খাওয়ায় এইডস হয়েছে।কারণ সেই ঝালমুড়িওয়ালারও এইডস ছিল।এরপএ থেকে এসব আর খাই না।কারণ এখনি মরার ইচ্ছা নেই।আমি ক্ষুদ্র মানুষ হলেও আমার স্বপ্ন অনেক।
-আঙ্কেল
বয়স প্রায় ষাট হবে। পরনে সাদা শার্ট এবং লুঙ্গি।মুখে ঘন দাড়ি।চোখে চশমা।প্রচণ্ড হাঁপাচ্ছেন।
-জ্বী?
-আমাকে একটু বসতে দিবেন।বসার জায়গা পাচ্ছি না।
ভদ্রলোক কাতর কণ্ঠে বললেন।
-জ্বী অসুবিধা নেই, বসুন।আপনি পানি খাবেন?
ভদ্রলোকের দুই চোখে আনন্দ দেখে খুবই ভালো লাগলো।ভদ্রলোকের পানি খাওয়ার কায়দাও দেখার মতো।
আমি বের হয়ে ফুটপাতের উপর হাঁটতে লাগলাম।স্কুলের ছুটি হয়ে গেছে। সারি সারি মেয়ে বের হচ্ছে।সবার মুখ হাসিখুশি। বের হয়েই সবাই ঝালমুড়ি, ফুচকা,হাওয়াই মিঠাই কিনতে লাগলো।মর্নিং শিফটের স্যারেরাও বের হয়ে চা কিনতে লাগলেন।
-মারুফ
কণ্ঠটা চিনলাম।যে কণ্ঠ সবসময় আমার শুনতে ইচ্ছা করে-সেই কণ্ঠ।
পিছনে ফিরে দেখলাম অরণি দাঁড়িয়ে।হালকা নীল রঙের শাড়ি পড়া।হাতভর্তি চুড়ি।ঠোঁটে সামান্য লিপস্টিক। কপালে টিপ পড়লেও তা মাঝখানে হয়নি।তবে এটা সহজে কেউ খেয়াল করবে না।
আমি হাসিমুখে বললাম- অরণি,কেমন আছো?
অরণি উত্তর দিলো বা।ওর চোখ কেমন ছলছল করতে লাগল
-”তোমার কি হয়েছে বল তো” অরণি ভারী গলায় জিজ্ঞাসা করল।
-কিছুই হয় নি তো।আমার আবার কি হবে?
-তুমি ফোন ধরো না,গিটার ক্লাসেও আসো না।তোমার মামার খবর কেন পত্রিকা থেকে জানতে হল?
আমি চুপ হয়ে গেলাম।এসবের উত্তর নেই আমার কাছে। বিষয় পাল্টানোর জন্য বললাম-স্কুলে যাওনি?
-টপিক পাল্টাচ্ছো কেন?
-পাল্টাচ্ছি না।বলব এ নিয়ে কথা।আগে বল স্কুলে যাওনি কেন?
-আজ রাতুলের জন্মদিন।মনে নেই?আজ ওর বাবা আমাদের কক্সবাজার নিয়ে যাবেন।
কথাটা শুনে কেমন ধাক্কা লাগলো।মনে হতে লাগল শীঘ্রই অরণিকে বিদায় বলতে হবে।তবে এখনই কি সময়? এখনি বলব?ওকে কত সুন্দর লাগছে।ইচ্ছা করছে ওর হাতটা একবার ছুঁই।ওর চুলগুলির মাঝে মুখ লুকাই।না,ভেঙে পড়া যাবে না।ওকে বলতেই হবে।আমি নিজেকে শক্ত করে বললাম-অরণি,কিছু কথা ছিল।
-এখন না,চল আমার সাথে
-কোথায়?
-ধানমণ্ডিতে।সন্ধি ভাই তার সব স্টুডেন্টদের আজ ট্রিট দিবেন।সন্ধি ভাই ফাইয়াজকে পাঠাতেন কিন্তু ওর বদলে আমি আসলাম
-হঠাৎ ট্রিট কেন?
অরণি হাসিমুখে বলল- ব্রাজিলের একটা মিউজিক ফেস্টিবলে ওনাকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে।১ বছরের প্রজেক্ট। তাই
-ভালো তো।ভাইয়ার প্রতিভা কাজে লাগবে।
-হ্যাঁ এখন চল
-স্কুল আছে তো।
-একদিন বাদ দাও।আমাদের ফ্লাইটও দুইটায়।কিছুক্ষণ গল্প করা যাবে।
আমার খুবই ইচ্ছা করছে যেতে।রিকশায় গেলে গা ঘেষে বসা যাবে।বাংলাদেশের রিকশার সাইজ আস্তে আস্তে ছোট হয়ে যাচ্ছে।গা ঘেঁষে বসার সুযোগ অনেক।
তার বদলে বলে উঠলাম-ভাইয়া কবে যাবেন?
-অক্টোবরের ১২ তারিখ
-আজ তো ৫ তারিখ।আমি এই কয়দিনের মধ্যে গিয়ে দেখা করে আসব।
অরণি অবাক হয়ে বলল- তুমি যাবে না?
-এই ড্রেসে যাওয়া যায় না অরণি।তার উপর কিছু কাজ ছিল আমার
-কি কাজ?
-আছে কিছু কাজ
-আমাকে বলা যায়?
-না।
-তুমি তাহলে আসবে না?
-পারলে আসলেই আসতাম।তুমি বরং চলে যাও।আমি রিকশা ঠিক করে দেই।
অরণি আর অনুরোধ করল না।আমি রিকশা ঠিক করে দিলাম।ও রিকশায় উঠে বলল- মারুফ আমরা আসলে কি?তুমি-আমি বন্ধু না।প্রেমিক-প্রেমিকা না।তবুও আমরা কাছাকাছি থাকতে চেষ্টক করি।এটা কি?
আমি বললাম-তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।
অরণি মাথা হেঁট করে বলল-আঙ্কেল যান।
আমি পিছনে ফিরে আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগলাম।আমার গলা আস্তে আস্তে ভারি হয়ে যাচ্ছে।চোখে পানি আসতে লাগল।স্কুলের কাছাকাছি এসে দেখি সিটিংয়ের ভদ্রলোক গেটে দাঁড়ানো।
উনি চিনতে পেরে এসে বললেন-আব্বাজান,মন খারাপ?
আমি মাথা নাড়লাম।
উনি বললেন- মন খারাপ হওয়া ভালো।বুঝলেন আব্বাজান।এতে নিজের আত্মা শুদ্ধ করা যায়।
১১
বিছানার উপর একটা লাল চামড়ার ডায়েরি।দেখতে সুন্দর। মলাটে লেখা-”we know what we are,but not what we may be”
কথাটা চেনা চেনা লাগছে। কোথায় যেন পড়েছি।লক্ষ করে দেখলাম আমি আমার গায়ের শার্টে দাগাচ্ছি।আমি নিজেই অবাক হলাম।নিজে ইচ্ছা করে কেন শার্টে দাগাচ্ছি বুঝলাম না।নিজের হাতের উপর আমার সামান্যটুকু নিয়ন্ত্রণও নেই।তবে সামনে ডায়েরি থাকা সত্ত্বেও শার্টে কেন দাগাচ্ছি খুব জানতে ইচ্ছা করল।
কিছুক্ষণ পর দরজা খোলার শব্দ পেলাম।সামান্য ভয় পেলাম।আমি রীতিমতো বুঝে গেছি এটা স্বপ্ন।ঘুমের মধ্যে অনেকেই বুঝে যে সে স্বপ্ন দেখছে।আমি তাদের একজন।দরজার ওপাশে কি সেটা ভেবে ভয় করতে লাগলো। আমার বেশিরভাগ স্বপ্নই দুঃস্বপ্ন হয়।একটা সময় পর এসব দেখতে দেখতে অভ্যাস হয়ে গেলেও ভয়টা এখনো আছে।
দরজার ওপাশ থেকে যখন একরাশি চুল দেখলাম তখন সামান্য খটকা লাগল দুঃস্বপ্ন কখনো একরাশি চুল দিয়ে শুরু হয় না।একরাশি চুল থেকে সেটা হল একটা নারীর দেহ।শাড়ি পড়ায় পিট দেখা যাচ্ছে।সাদা মসৃণ পিঠ।ঘুরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে গিয়ে আমার দিক তাকিয়ে সামান্য হাসলো।আমি তখন দুঃস্বপ্ন দেখার চেয়েও বেশি ভয় পেলাম।কারণ এটা অরণি।অরণি চুল ঠিক করতে করতে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো। এসেই খাটে বসে অবাক হয়ে বলল- একী? নতুন শার্টে এভাবে কেউ দাগায়? তুমি দেখি চাদরেও দাগাচ্ছো।
তাকিয়ে দেখলাম আসলেই দাগাচ্ছি।
অরণি হাত ধরে বলল- লেখতে পারছো না?
-না।
-একটুও না?
-না।
-তাহলে এক কাজ কর।আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকো।আমার চোখে কবিতার লাইন লেখা আছে।সেগুলো পড়।
হঠাৎ শরীরটা কেমন ভারী হয়ে গেল।আমি অরণির হাত ধরে বললাম- অরণি,তুমি বুঝো না?তুমি আমি একসাথে-এটা যে অসম্ভব?
অরণি হাত ছাড়িয়ে নিল। শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢুকে ফেলল। আমি জোর করে ওর মুখ থেকে আঁচলটা সরিয়ে ফেললাম।দেখলাম ও কাঁদছে।সেই অবস্থাতেই বলল- আমরা কি কখনো স্বপ্নতেও একসাথে থাকতে পারি না?
আমি উত্তর দিতে যাব তখনই মনে হল খাট কাঁপছে।খাটের সাথে দেয়াল,দেয়ালের সাথে সবকিছু।সব যেন একসাথে বলতে লাগলো- মারুফ,ওঠ।মারুফ ওঠ।
ঘুম ভেঙে গেল।দেখি মা দাঁড়িয়ে।বিরক্ত হয়ে বললেন - ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় করে কি বলিস?
আমি লজ্জা পেয়ে বললাম- কিছু না।
-যাই হোক। শোন,বাসায় আটা নেই।টাকা নিয়ে নাস্তা কিনে আন।
-আচ্ছা।
মা চলে যাওয়ার পর খাটে কিছুক্ষণ বসে থাকলাম।অরণিকে কথাটার উত্তর দেওয়া হয়নি।
আমার পরোটা খেতে ইচ্ছা করে না।বিশেষ করে বাইরের।মনে হয় পুরো বোতল তেল দিয়ে বানায়।গন্ধও বিদঘুটে।কেমন বমি বমি গন্ধ।কোনমতে রুটি আর ডাল কিনে বাসার দিক রওনা দিলাম। খুব মনে পড়ছে অরণির প্রশ্নটা।ও আর আমি কি অন্তত স্বপ্নের মধ্যেও একসাথে থাকতে পারি না? না বোধহয়।মানুষ অবাস্তব বিষয় নিয়েই স্বপ্ন দেখে।এই কারণেই এর নাম স্বপ্ন।স্বপ্ন প্রতিদিন আমাদের বুঝাচ্ছে যে আমাদের ক্ষমতা নেই।মানুষের জীবন আসলে একটা গোলকধাঁধা। আর স্বপ্ন এর প্রবেশ পথ।
-মারুফ
কণ্ঠটা চেনা।আবার অচেনা।আগে শুনেছি মনে হল।পিছনে ফিরে হকচকিয়ে গেলাম। এযে প্রথম আলোর সেই সাংবাদিক। ওনার হাতে বড় মিষ্টির প্যাকেট।
-কেমন আছো,মারুফ?
-জ্বী ভালো,আপনি হঠাৎ?
সাংবাদিক সাহেব অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন।তারপর আস্তে আস্তে বললেন- আমাকে ফরিদা বলেছিলো ও কখনো বালিশ মিষ্টি খায়নি।আমার দাদার বাড়ি নেত্রকোনায়।কিছুদিন আগে বেড়াতে গিয়েছিলাম।তোমার সাথে দেখা হয়ে ভালোই লাগল।তুমি নিয়ে যাও।আমি আর গেলাম না।
-কেন? আসুন না।
- আজ থাক, আরেকদিন।আর মারুফ,ফরিদা ছাড়া বাকি সবাইকে তোমার মিথ্যা বলতে হবে এ নিয়ে। পারবে?
-জ্বী।
-thank you আসি।
সাংবাদিক সাহেব উত্তরের অপেক্ষা না করে হাঁটতে শুরু করলেন।
১২
-মিষ্টি কই পেলি রে?
নানী আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।কণ্ঠে অবশ্য আগ্রহ থাকলেও চোখে সন্দেহের আভা।এখন কি করি?সাংবাদিক সাহেব বলেছেন মিথ্যা বলতে।কিন্তু কিভাবে বলব তাতো বলে যাননি।এই পরিস্থিতিতে মিথ্যা বলাও খুব রিস্কি। কারণ সে মিথ্যার সাথে বাস্তবতা, যুক্তি নাও আনতে পারি।সাধারণ মিথ্যাগুলি সবসময় ‘না' দিয়ে শুরু হয়।ছোট কাহিনিও থাকে সেই ‘না' শব্দটির মাঝে।দরজার পেছনে দেখলাম খালামণি দাঁড়ানো।চোখ মুখে আতঙ্ক।
আমি এক নিঃশ্বাসে বললাম-পলাশ দিয়েছে।
মা জিজ্ঞাসা করলেন-পলাশ কে?
-মুগদা আইডিয়াল থেকে এসেছে, মা।ওর বাবার হঠাৎ ট্রান্সফার হয়ে গেল।ভালো ছেলে।
নানী বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- ও তোকে মিষ্টি কেন দিবে?
আমি যাতে সবার বিশ্বাস হয় তার জন্য উচ্চ স্বরে বললাম - এক বন্ধু কি আরেক বন্ধুকে কিছু দিতে পারে না?
কথাটা যুক্তিসঙ্গত। নানী আর কিছু বললেন না।টেবিলের উপর প্যাকেটটা দেখে বললেন- গয়নাথ দোকানের বালিশ মিষ্টি?বাহ!খাসা বন্ধু তো। বাসায় আনলি না কেন ওকে?
মিষ্টিটা আসলেই দেখতে সুন্দর। সাইজ প্রায় ১৩-১৫ ইঞ্চির মতো। উপরে ক্ষীরের প্রলেপ দেওয়া। মা ছুরি দিয়ে কাটতে যাবেন তখনই নানী বললেন-এই সাবধানে,আস্তে কাট নইলে রস ছিটে গায়ে লাগবে।
কাটার সাথে সাথেই হিমছড়ির ঝরণার মতো রস বের হতে লাগল।নানী একটু খেয়ে তৃপ্ত হয়ে বললেন-কি মিঠা!
মা বললেন-মা কম খাও।ডায়বেটিস আছে তোমার।
নানী রাগী গলায় বললেন-চুপ থাক।সময় শেষ আমার।আর নিয়ম মানতে পারব না।
মা খালামণিকে বললেন- তুইও আয়।খেয়ে দেখ একটু।
সকালের নাস্তা আমরা সারলাম বালিশ মিষ্টি দিয়ে।বহুদিন পর নানীকে ছেলে হারানোর কষ্ট ভুলে যেতে দেখলাম।
পলাশের কথাটা কিন্তু মিথ্যা নয়। এই নামে আসলেই আমাদের ক্লাসে একটা ছেলে এসেছে এবং ঐ আমার একমাত্র বন্ধু।পলাশরা আগে মুগদায় থাকতো।ওর বাবা একজন বিসিএস ডাক্তার।পলাশ প্রথম দিন ক্লাসে এসেই কারো সাথে কথা না বলে আমার সাথেই প্রথম কথা বললো।দুই মিনিটের আড্ডাতেই বুঝেছিলাম ও কোন পর্যায়ের ছেলে।আমি সেদিন যে বলেছিলাম-তুমি যে এখন আসলে,তোমার রেজিস্ট্রেশনে ঝামেলা হবে।এস.এস.সি এর সময় সিট খারাপ জায়গায় পড়তে পারে।
ও শান্ত গলায় বলেছিল-পড়ুক।বই পড়লে আর পড়াশোনা করলে চিন্তা কি?পলাশ এই কথার প্রমাণ দিল কেমিস্ট্রি ক্লাসের সময়।জব্বার স্যারকে পুরা পর্যায় সারণি মুখস্থ বলে দিয়ে ক্লাসে সাড়া ফেলে দিল।এই ব্যাপারটা হয়ত অনেকের কাছে ভিত্তিহীন, কিন্তু যে পর্যায় সারণি মুখস্থ পারে সে যে কতখানি কেমিস্ট্রি আয়ত্ত্ব করে ফেলেছে তা কেউই বুঝবে না।পলাশ আর আমার সম্পর্ক কয়দিন পরই তুমি থেকে তুই এ নেমে এল। প্রথম প্রথম ওকে “তুই” বলতে গলায় আড়ষ্টতা আসতো।এখন ঠিক হয়ে গেছে।পলাশ যখন খুব ছোট তখন ওর মা মারা যান।পলাশ বড় হচ্ছে ওর ছোট ফুফুর কাছে।ওর ছোট ফুফু আর বিয়ে করেননি কেন সে সম্পর্কে পলাশ কিছু বলতে চায়নি।আমিও আর জোর করিনি।সবার জীবনে গোপনীয়তা থাকবেই।তা মেনে নেওয়া উচিত।
পলাশের কারণে নতুন করে পড়াশোনার প্রতি আমার এক ধরনের ঝোঁক জন্মেছে।পলাশের পড়াশোনা একদিন দেখে খুবই ভালো লাগল।মনে মনে তখন ভাবলাম-”ইশ!আমিও যদি এমনে পড়াশোনা করতাম”। পরে মনে হল এটা তো আমার উপর নির্ভরশীল। কাজে আফসোস কেন করব? প্রথম কয়দিন পড়াশোনায় মন না বসলেও পলাশের সাহায্যে সব ঠিক হয়ে গেছে।পলাশের পরিচিত এক লাইব্রেরি আছ।অবশ্য পরিচিত না বলে পলাশদের লাইব্রেরি বলাই অর্থবহ। পলাশের মামার তিনটা লাইব্রেরি আছে।এরমধ্যে একটা আইডিয়ালের কাছে।পলাশ লাইব্রেরির লোকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। আমি এখন প্রায়ই ওখান থেকে বাকিতে বই নেই।পরে টাকা মিটিয়ে দেই।পলাশ আরেকটা কাজ আমাকে শিখিয়েছে।ও সেটাকে বলে “word collection “।পলাশ যখনই কোনো বাংলা বা ইংলিশ বই পড়ে তার কিছু শব্দ তুলে রেখে সাথে antonym, synonym লিখে ফেলে। এরকম লিখতে লিখতে পুরো ডিকশনারি তৈরি করে ফেলেছে।ওর দেখাদেখি আমিও এরকম করা শুরু করে দিয়েছি।
চশমার ফাঁক দিয়ে বললেন-কি নাম?
-মারুফ হাসান।
-দেখি কি লিখেছো?
দেওয়ার সময় কেমন জানি হ্যাঁচকা টান দিলেন।পড়ার সময় নিজের অজান্তে হু,হা করছেন।আমি বাড্ডায় সদ্য খোলা এক কাগজে লেখা জমা দিতে এসেছি।পত্রিকার নাম-কান্ডারি হুঁশিয়ার।নাম শুনলেই বুঝা যায় এটা রাজনৈতিক কবিতা।রাজনৈতিক কবিতা গল্প,কবিতা কেন ছাপাবে বুঝতে পারছি না।যার কাছে লেখা জমা দিলাম তিনি নিজেকে এডিটর হিসেবে পরিচয় দিলেন।টেবিলে ওনার ভিজেটিং কার্ড পড়ে আছে।তা থেকে জানলাম নাম মুনীর চৌধুরী। টেবিলে একটা বই পড়ে আছে।নাম “জাগ্রত নারী”।মুখে হাসি চলে আসলো।বর্তমানে নারীদের নিয়ে লেখা একটা স্টাইল হয়ে দাড়িয়েছে।অথচ যারা এসব লিখে তারা নিজেরা কতখানি নারীদের অধিকার নিয়ে সচেতন কে জানে।উনি মুখ তুলে হাসলেন।এই সুন্দর সকালটা নষ্ট হল ভদ্রলোকের হলুদ দাঁত দেখে।উনি লেখাটা নামিয়ে বললেন-প্রথম লেখা?
-না,আগেও লিখেছি।
উনি হাহা করে হাসলেন।এভাবে হাসছেন কেন-খুব কড়াভাবে বলতে ইচ্ছা করল।
হাসি বন্ধ করে তারপর বললেন-শুনো,কবিতা তো রচনা না,যে প্রাণ খুলে যা তা লিখবে।ছন্দ মানতে হবে।
-ছন্দ মেনেই লিখেছি। তবে কিছু জায়গায় ছন্দ মানা প্রয়োজন বোধ করিনি।
উনি শান্ত গলায় বললেন-শুনো,এসব ফাজলামি বাদ দাও। কবিতা লিখতে বসে গাজাখুরি শ্লোক লিখলে জীবনেও কবি হতে পারবে না।আপনার উপমাও দেখি অর্থবহ না।
এখনি সময় মনে হচ্ছে
নতুন করে
তোমার গালে চন্দ্রের মতো
একটি চুম্বন দেওয়ার
সময় এখনই।
এর মানে কি? চন্দ্রের মতো চুম্বন দিয়ে কি বুঝাতে চাচ্ছেন?
নির্মলেন্দু গুণ তার এক কবিতায় লিখেছিলেন”তুমি দিয়েছিলে স্তনবন্ধন খুলে,আমি দিয়েছিনু তাতে দুগ্ধ”উনি ওরকম লিখতে পারলে আমি কি দোষ করেছি?
এডিটর চুপসে গেলেন।ওনার জ্ঞানের খাতা বোধহয় ফুরিয়ে গিয়েছে।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম-কবিতাটা ফেরত দিন।আমি এখানে ছাপাবো না।
-আচ্ছা আচ্ছা,ঠিক আছে।আমি তো বলিনি ছাপাবো না।কিছু শব্দ খালি পরিবর্তন করতে হবে।
-না,আমি ছাপাবো না।
এমন জেদ ধরছো কেন?
-যা ইচ্ছা করব।আমি তো আর কবিতা না যে ছন্দ মেনে চলব।
বের হওয়ার সময় কবিতাটা ড্রেনে ফেলে দিলাম।
১৩
হাঁটতে হাঁটতে হাতিরঝিল এর সামনে চলে এসেছি।স্কুল হতে আর ৪০মিনিট বাকি।তার চিন্তাভাবনা আমার নেই।আসলে স্কুলে যাওয়ারই ইচ্ছা হয় না।সেই একই ক্লাসরুম,একই টিচার, তাদের একই কথা শুনে পাঁচ ঘণ্টা কাটাতে হয়।বর্তমানে টিচারদের মধ্যে আরেকটা বিষয় ঢুকে গেছে।তা হল অপমান করা।টিচারদের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা থাকে এ নিয়ে।কে কত বেশি একটা ছাত্রকে অপমান করতে পারে তার প্রতিযোগিতা।
ফ্লাইওভার এর সামনে এসে শুনলাম নাটকের শুটিং হচ্ছে।নাটকের নাম”আজ নিব বিদায়”।যতদূর জানলাম নাটকের নায়ক নায়িকা অপূর্ব আর মেহজাবিন। এখন অপূর্ব সাহেবের ডায়লগ দেওয়ার সময়।ভিড়ের লোকজন অপূর্ব সাহেবকে দেখে হইচই শুরু করে দিল। ওখানে না গিয়েই দূর থেকে মেহজাবিনকে দেখা যাচ্ছে।ওনার মুখে ঘন মেক আপের প্রলেপ।যেন সাদা ইয়েতি।মনে হল কিছুক্ষণের মধ্যেই উনি সবাইকে তাড়া করে বেড়াবেন।এখনকার নাটক আর আগেরকার দিনের যে কত আকাশ-পাতাল তফাৎ।তখনকার দিনে মুখ্য বিষয় অভিনয় আর এখন হল মেক আপ।অপূর্ব সাহেবের চেহারাও কেমন টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনের শিশুদের সাদা দাঁতের মতো চকচক করছে।অবশ্য মেক আপের জন্য সাবিলা নূর এর জুড়ি নেই।উনি মনে হয় মেক আপ না,মুখে তীর কোম্পানির আটা মাখেন।
‘আজ নিব বিদায়’ কথাটা সুন্দর। কথাটার মধ্যে আবেগ,অনুভূতি,দুঃখ আছে।দুর্ভাগ্য এত সুন্দর একটা কিনা টাইটেল হবে একটা বস্তাপচা নাটকের।তাও আবার অপূর্বের নাটক।মানে পচা তেলে আবার সমুচা ভাজা।”আজন নিব বিদায়”কথাটা দিয়ে একটা কবিতা লেখা যায়।একটা কবিতায় মাত্র এক লাইনই আবেগের জন্ম দিয়ে পাঠকের মনে দাগ কাটতে পারে।মনে মনে ভাবতে লাগলাম-
আজ নিব বিদায়
তবে কার সাথে?
আমি জানি না,
ভিন্নদেশের জোছনায়
ছায়াহীন গাছের স্পর্শে
নিব বিদায়
নতুন কবিদের আদলে।
রবিবার রোদে
পালকের পুরনো ঘরে
অপূর্ব নীলিমাময় আকাশে
নিব বিদায়
আবার ধানক্ষেতের হাসির মুকুরে।
-এই শুনো
আমার রাগ উঠল।শুধু চিন্তার ব্যাঘাত ঘটা নয়,আরেকটা কারণ হল কবিতায় অপূর্ব শব্দটা ব্যবহার করে ফেলেছি।এখন অপূর্ব বললেই কেবল টিভি নাটকের কাতলা মাছ অপূর্বকে মনে হয়।অবশ্য শব্দের দোষ নেই।দোষ আসলে মানুষদের। যেমন-হিটলার।হিটলার শব্দটা সুন্দর। কিন্তু এই নামটা এখন ঘৃণিত শুধু একটা মানুষের কৃতকর্মের জন্য।
ঘুরে দেখলাম পচিশ-ছাব্বিশ বয়সের একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে।পরনে সালোয়ার কামিজ।ডান হাতে একটা সোনালি বালা।গায়ের রং ফর্সা।দেখে মনে হচ্ছে উনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। এখনই হইহুল্লোর শুরু করে দিবেন।
-জ্বী,বলুন
মেয়েটি উসকু খুসকো করে বলল-তুমি মারুফ?
-আপনি চেনেন আমাকে?
-তোমার মামা বলেছিল তুমি প্রায়ই এখানে হাঁটতে আসো। আজ শুটিং এর কাজে এখানে এসেছিলাম।এসেই দেখতে পেলাম তোমাকে।
আমি অবাক হয়ে বললাম-আপনি মামাকে চিনেন?
মেয়েটি ওড়না দিয়ে মুখ মুছল। বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল-মোর্শেদ আমার স্বামী।
শুটিং শেষ হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই।হাতিরঝিলের পাশে কিছু রেস্টুরেন্ট আছে।আমি আর নীলা মামী বসে আছি।কিছুক্ষণ আগে এখানে অপূর্ব সাহব ছিলেন।দুই তিনটা অটোগ্রাফ আর একটা ইন্টারভিউ দিয়ে চলে গেছেন।টেবিলের সামান্য পাশাপাশি হওয়ায় সাংবাদিকের একটা প্রশ্ন সামান্য শুনেছিলাম।প্রশ্নটা ছিল-যে নাটকের শুটিং হল সে নাটক নিয়ে কিছু বলুন
অপুর্ব সাহেব তার সাথীদের মতোই যান্ত্রিকভাবে বললেন-নাটকের গল্প ভালো মেহজাবিন থাকায় কাজ করতে সুবিধা হয়েছে।এই নাটকের মাঝে দর্শকরা ভিন্ন ধারার গল্প খুঁজে পাবে।
দুইশ বছরের প্রথাগত উত্তর।
নীলা মামীর অস্থিরতা এখনো কাটেনি।উনি বারবার আশেপাশে তাকাচ্ছেন।কিছু বলতে গিয়েও বলছেন না।আরো পাঁচ মিনিট পর উনি আস্তে আস্তে বললেন- তুমি কিছু খাবে?এখানে ভালো কোল্ড কফি বানায়।
-না,আপনিও অভিনয় করেন?
উনি হেসে বললেন-নাহ,অত বড় সৌভাগ্য যদি হত।আমি এই নাটকের পরিচালকের সহকারী।
এরপর আবার নীরবতা। আমি হঠাৎ একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম।সা দেখে হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল আমার।ওনার চুলের সিথিতে সিঁদুর।ওড়না সরানোয় দেখতে পেলাম
আমি বললাম-আপনি একটা বিষয় আমার কাছ থেকে গোপন করেছেন।
উনি উত্তর দিলেন না।
-আপনার সিথিতে সিঁদুর। তাহলে নাম নীলা হবে না শুধু।আর মামা মুসলমান। উনি আপনার স্বামী হতেই পারেন না।
উনি মুখ নামিয়ে ফেললেন।দেখলাম উনি কাঁদছেনও।এই অবস্থায় কিভাবে স্বান্তনা দেই? আমার জন্যেই তো উনি কাঁদচ্ছেন।
নিজেকে সামান্য শক্ত করে বললেন-মোর্শেদ আমাকে নীলা বলে ডাকত।আমার আসল নাম ললিতা রায়।
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন-ধর্ম দিয়ে সব বিচার করা যায় না মারুফ।মাঝে মাঝে ভালোবাসাকে প্রাধান্য দিতে হয়।হয়ত আমি হিন্দু,তাই বলে মোর্শেদের প্রতি আমার ভালোবাসার কোনো কমতি ছিলনা।আমি ওকে আমার স্বামী হিসেবে পরিচয় হবার দিনই মেনে নিয়েছিলাম এবং সেভাবেই ভক্তি করতাম।
-আপনি মামাকে কয়বছর ধরে চিনতেন?
-অনেক বছর। যেদিন ও নিখোঁজ হয়,সেদিনই আমরা বিয়ে করেছিলাম।
-পুলিশকে কিছু বললেননি কেন?
নীলা মামী ভারি গলায় বললেন- বিশ্বাস কর,আমি নিজে কতবার চেয়েছি পুলিশকে জানাতে।কিন্তু পারিনি।কারণ আমার অবস্থাটা দেখ।চারপাশে আমার পরিবারের দুর্নাম হচ্ছে।প্রথমে মোর্শেদ মুসলিম হলেও আমার পরিবার মেনে নেয়।কিন্তু যখন ও নিখোঁজ হয় এবং পুলিশ ওকেই আসামি হিসেবে সন্দেহ করে তখন পরিবারের কথা ভেবে আমার চুপ থাকতে হয়েছে।মা কতবার বলেছে সিঁদুর মুছে ফেলতে।কিন্তু এ সিঁদুর যেয়ে মোর্শেদের দেওয়া।
উনি থামলেন
কিছুক্ষণ পর আবার বললেন- এখন আমি বাধ্য হচ্ছি এসব করতে।কারণ আমার আর পথ খোলা নেই
-কি করবেন আপনি?
-আমার দ্বিতীয় বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে।সামনের মাসে আমার বিয়ে।এই কাজটা করার আগে আমি মোর্শেদের খুব কাছের কাউকে সব বলতে চেয়েছিলাম।তা পূরণ হওয়ায় ভগবানকে ধন্যবাদ।
উনি উঠে দাড়ালেন।এবার আমার গলা ভারি হয়ে গেল।আমি বললাম-আপনার সাথে আর দেখা হবে না?
উনি উত্তর না দিয়েই রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে গেলেন।আমি বাড়ি ফিরলাম প্রচন্ড জ্বর নিয়ে।
১৪
আমার ঘুম ভেঙে গেল।গায়ে এখন মনে হয় না জ্বর আছে।কপালে হাত রাখলাম।সামান্য উষ্ণ।মাথাটা ঝিমঝিম করছে।চুলগুলো ধরে একটা টান মারতে ইচ্ছা করল।মাথা ঝিমঝিম করার সময় এমনটা করলে প্রচন্ড আরাম লাগে।চুলে হাত দিতেই তালু আর আঙুল তেলতেলে হয়ে গেল।মা চুলে তেল দিয়ে দিয়েছেন।চুলে তেল দেওয়া আমার পছন্দ না।মাথাটা আঠালো হয়ে যায়।খুব ক্ষিধে লেগেছে।ঘুমানোর আগে খাইনি।আসলে বাড়ি ফেরার পর থেকেই ঘুমাচ্ছি।শরীরটা খুবই দুর্বল।খালি মনে আছে গেটের কাছে এসে পড়ে গেলাম।এরপর কিছুই মনে নেই।
এবারো ঘুম ভেঙেছে স্বপব দেখে।তবে দুঃস্বপ্ন নয়।যে স্বপ্ন দেখেছি তাতে আজই হঠাৎ মনে হল আমি বড় হচ্ছি।শরীরে একধরনের আকাঙ্কা আসছে।পুরুষদের আকাঙ্কা।আমি যে স্বপ্নটা দেখেছি তা অরণিকে নিয়েই।তবে এই স্বপ্নটাতে যা দেখল তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।স্বপ্নে অরণি ছিল নগ্ন।পুরোপুরি নগ্ন।চুল ছিল ছাড়া।শরীরটা জ্যোৎস্নার মতো ফর্সা।নগ্নতার মাঝেও যে লুকান্বিত সৌন্দর্য আছে তা শিল্প বুঝলেই উপলব্ধি করা যায়।স্বপ্নে আমার দৃষ্টি ছিল অরণির বুকের দিকে।আর আজব হলেও সত্যি যে এর জন্য আমার কোনো ধরনের লজ্জা বোধ হচ্ছিল না।অরণি আস্তে আস্তে এগিয়ে আসতে লাগল।সে মুহুর্তে খেয়াল করে দেখলাম যে আমিও নগ্ন।আমার তৈলাক্ত,চর্বিযুক্ত, শ্যামলা শরীরের প্রতি কখনো কোনো মেয়ে বশীভূত হবে কিনা তা আমি ভালোভাবে বলতে পারব না।স্বপ্নে যুক্তি,কারণ সব অস্পষ্ট থাকে।অরণি কাছে আসার সাথে সাথে আমি উঠে ওর ঠোঁটে চুমু খেলাম। গোলাপের পাপড়ির মতো নরম ঠোঁট।এই কাজটা করতে খুবই অবাক লাগছিল।চুমুর উত্তর চুমুর মাধ্যমে দিতে হয়।অরণিও দিতে লাগল।তখনই আমি অরণির বুকে হাত রাখলাম।কোনো সঙ্কোচ,লজ্জা কিছুই নেই।আমার খুব ভালো লাগতে লাগল।অরণি তখন হঠাৎ ফিসফিস করে বলল-এই দুষ্ট,তোমার হাত এত ঠান্ডা কেন?
সেই মুহূর্তেই ঘুম ভেঙে গেল।ঘন অন্ধকারপূর্ণ ঘরের মধ্যেই আমি বিছানায় অরণিকে খুঁজতে লাগলাম মনের ভুলে।হুঁশ ফেরার পর আফসোস লাগল।কারণ কেউ একটা ভালো স্বপ্ন একবারের বেশি দেখে না।আমারো অরণিকে স্বপ্নে এত নান্দনিকভাবে দেখা হবে না।
বিছানায় ফোনটা খুঁজতে লাগলাম।আমি ঘুমাবার সময় ফোন নিয়ে শুই।আজ তো আর নিয়ে শুতে পারিনি।যদি না পাই তাহলে বিছানা থেকে নেমে খোঁজা সম্ভব না।আমার শরীরে তেমন শক্তি নেই।বার বার মিবে হচ্ছে বিছানা কাঁপছে।খুঁজতে খুঁজতে পায়ের তলায় ফোনটা পেলাম।রাত ২.৩০ বাজে।আজকে অরণিকে ফোন দেওয়ার ইচ্ছা ছিল।কতদিন ওর সাথে কথা বলি না।দুই সপ্তাহর মতো হল ও কক্সবাজারে।আমি নিজে গিয়েছিলাম একবার।খুব ছোট থাকতে।সমুদ্রে রাতে বেলা নামলে মনে হয় সমুদ্র গজরাচ্ছে।তখন নামাটা ভীতকর।তবে স্থানীয়রা ঠিকই টুরিস্টদের সামনে জামাকাপড় খুলে নেমে যায়।পেপারে পড়েছি ইদানিং ওখানে বলে কুকুরদের সংখ্যা বাড়ছে।এরা টুরিস্টদের তাড়া করে বেড়ায়।আমার আবার সেখানে যাবার ইচ্ছা।আমার কাছে বিছানায় শুয়ে মরার চেয়ে সমুদ্রে ডুবে মরাই বেশি যুক্তিপূর্ণ।
ফোনটা পেয়ে খুবই ভালো লাগল।দরকারি সময়ে কিছুই পাওয়া যায় না-কথাটা অর্ধ সত্য।ফোনটা পেয়েই কেমন আলসেমি এসে গেল।ওয়াই ফাই চালু করলাম।এখন কেউ অনলাইনে থাকবে বলে মনে হয় না।ফেসবুকের টাইমলাইন দেখতে লাগলাম।এটাও একটা বিনোদন। আয়েশি ভঙ্গিতে টাইমলাইন দেখে যাওয়া। এরমধ্যে মজার বিষয়ও দেখা যায়।যেমন- কালের কণ্ঠের পোস্ট”চুমু খেলে স্বাস্থ্যের কি উপকার হয় দেখে নিন” অথবা “খাইয়া হালামু” নামার এক পেইজের পোস্ট।জনি ডেপকে নিয়ে তারা ট্রল বানিয়েছে।কিছুক্ষণ পরই এই আধুনিক বিনোদনকে পথের কাঁটা লাগে।ম্যাসেঞ্জারে ঢুকলাম।মাত্র দুইজন অনলাইনে।এর একজন অরণি।খুবই অবাক লাগলো।আমি বুঝলাম না ম্যাসেজ দিব কিনা।অবশ্য ম্যাসেজ না,ফোন দিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করছে।কতদিন কথা হয় না।কিন্তু এমন স্বপ্ন দেখার পর ফোন দিতেও ভয় লাগছে।মুখ ফসকে কিছু বলে ফেললেই ঝামেলা হবে।মেয়েরা যুক্তি বুঝে না।মেয়েরা বুঝে ঝগড়া।
আমি ম্যাসেঞ্জারে অরণিকে ফোন দিলাম।প্রথমবার ধরলো না।আবার দিলাম।বুঝলাম নেট অন করে রেখেছে।আমি যেই’End Call’ এ প্রেস করব তখনই অরণি ধরল।খুশি খুশি গলায় বলল-হ্যাঁলো।
আমি চুপ হয়ে গেলাম।মনে হল এই হ্যাঁলো শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে পড়ব।
-হ্যাঁলো,মারুফ?
-কেমন আছো,অরণি?
-আমি জানতাম তুমি আজ ফোন দিবে।
-বাহ!খুব ভালো।
-তুমি অবাক হওনি?
-মেয়েরা সবসময় বেশি বুঝে। তুমি এখনো জেগে আছো কেন?
-ঘুমাতে ইচ্ছা করছে না।সিগারেট খেতে ইচ্ছা করছে।
-তুমি খাও নাকি?
-না,তবে মার স্বামীকে দেখে খেতে ইচ্ছা করছে
আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।সিগারেট খেলে ঠোঁট কালো হয়ে যায়।আমি চাই না অরণির ঠোঁট মাইক টাইসনের মতো কালো হয়ে যাক।
আমি বললাম- খবর কি তোমার বল
-রাখো তোমার খবর। তুমি কোনো কাজই ঠিকমতো কর না।সন্ধি ভাইয়ার সাথে আর দেখা করতে যাওনি কেন?
আমি চমকে উঠলাম।সব্ধি ভাইয়ের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম।এখন কি বলি?ঝোঁকের মাথায় বলে ফেললাম-আসলে যেতাম,কিন্তু শেষে ভাইয়াকে বিদায় দেওয়ার মানসিকতা ছিল না।তাই যাইনি।
মনে মনে ভাবলাম বাহ!ভালো বলেছি।
কিন্তু অরণি কঠিন গলায় বলল- সামান্য সাহিত্যচর্চা কর দেখে এত আবেগপ্রবণ হতে হবে? তুমি না আবেগকে পাত্তা দাও না? আবেগ বলে তোমার কাছে খাচায় বন্দি বানর,যাকে ছেড়ে দিলে বাদরামি করে?
আমি অবাক হয়ে গেলাম।অরণি আমার কথা দিয়ে আমাকেই হারিয়ে দিল
-আমি সত্যি কথাটা বলতে চাই, অরণি।কিন্তু সম্ভব না।আমার কাছের কেউই জানে না।
-কি সেটা?
-আমি বলতে পারব না।
-তুমি দেখি মহা ধড়িবাজ ছেলে।
আমি প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্য বললাম- তোমাদের না আজ সেন্ট মার্টিন যাবার কথা?
-হু,কিন্তু খারাপ আবহাওয়ায় জন্য সরকার সব বন্ধ করে দিয়েছে।আগামী এক সপ্তাহ সকল ভ্রমণ বন্ধ।
-তোমাদের কই যাওয়া উচিত জানো? মহেশখালি।
-সেটা আবার কোথায়?
-কক্সবাজারে।ঘাট থেকে স্পীডবোট দিয়ে যেতে বিশ মিনিট লাগে।মহেশখালী বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ী দ্বীপ।ঐখানে ১২ হাজার বিরল প্রজাতির গাছ আছে।
-গাছপালা দেখে কি হবে?
-এভাবে বললে তো আমিও বলতে পারি যে সমুদ্রের পানির ঢেউ দেখে আর বালির মধ্যে হেঁটে কি হবে?এর চেয়ে পতেঙ্গার মতো বাঁধ দিয়ে মেরিন রোড বানালেই হয়।
-আচ্ছা বুঝেছি,রাতুলকে বলে দেখব।
আমার মধ্যে কয়দিন ধরেই একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল।যেই প্রশ্নটা করতে যাব তখনই অরণি বলল-জানো আজ পাঁচটা ছেলে আমাকে প্রপোজ করেছে।
-তাই নাকি?তো কি করলে?
-কি করব?ব্লক করে দিলাম।
-আহারে!আমি হলে অন্যভাবে বলতাম
-কি রকম?
-ওরা কি বলেছে?”I love you”?
-হু।
-আমি হলে বলতাম”আমি তোমার হাত ধরতে চাই”
-মানে?এটা কেমন কথা?
-এখন হয়ত ফালতু লাগছে।কিন্তু সঠিক সময়ে শুনলে বুঝতে
-তুমি কাউকে বলে দেখেছো?
-নাহ,কাকে বলব?
-আমি সামনের শুক্রবার ঢাকায় আসব।শনিবার আমি, ফারাজি,ফাইয়াজ আরো অনেকে খিওগাঁও যাব।তুমি আসবে?
-আসব
-সত্যি?
-হ্যাঁ,আচ্ছা অরণি।যাই এখন
অরণি চুপ হয়ে গেল।তারপর আস্তে আস্তে বলল-আচ্ছা
ফোন রাখার পর মনে হল প্রশ্নটা অরণিকে করা হয়নি।